বরগুনার বেতাগীতে কৃষিনির্ভর জনপদে কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা ‘গ্রীন লিভ ফ্যাশন’। স্থানীয় উদ্যোক্তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ কারখানায় কাজ করছেন ২৫ জন শ্রমিক, যাঁদের বড় একটি অংশ নারী। বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত ও প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় উদ্যোগটি স্থানীয়ভাবে আশার আলো দেখাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে ক্ষুদ্র এ শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের কাজীরহাটের তুলতলা এলাকায় গড়ে উঠেছে কারখানাটি। ২০২৫ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
দেশের উপকূলীয় এ জনপদে বড় কোনো শিল্পাঞ্চল না থাকায় কাজের সন্ধানে অনেক মানুষকে ঢাকা, সাভার, গাজীপুর কিংবা চট্টগ্রামের মতো শিল্পাঞ্চলে যেতে হয়। বিশেষ করে পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক নারীর পক্ষে দূরে গিয়ে কাজ করা কঠিন। এ অবস্থায় নিজ এলাকায় পোশাক কারখানা গড়ে ওঠায় তাঁদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কারখানা সূত্রে জানা যায়, এখানে কর্মরত ২৫ জন শ্রমিকের বড় একটি অংশ নারী। তাঁরা সেলাই, কাপড় কাটিং ও প্যাকিংয়ের মতো কাজে যুক্ত রয়েছেন। এর ফলে আগে ঘরে থাকা অনেক নারী এখন নিয়মিত কাজের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁদের উপার্জন পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো ও আর্থিক সচ্ছলতা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানাটিতে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা রয়েছে। নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ পেয়ে নারী ও তরুণদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ক্ষুদ্র শিল্পের বিস্তার ঘটলে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
কারখানায় কর্মরত রোকসানা আক্তার বলেন, “গ্রামীণ অনেক নারী আগে ঢাকা, গাজীপুর কিংবা চট্টগ্রামের মতো বড় শিল্পাঞ্চলে গিয়ে কাজ করতে পারতেন না। এখন বাড়ির কাছেই কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাঁদের জন্য আয় করা সহজ হচ্ছে।”
উপজেলার উত্তর করুণা গ্রামের বাসিন্দা ও কারখানার শ্রমিক তানিয়া বেগম বলেন, “এই ক্ষুদ্র কারখানাটি আমার মতো অসহায় গ্রামীণ নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। এখন নিজের আয় দিয়ে পরিবারের খরচে সহযোগিতা করতে পারছি। এতে আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে।”
কারখানায় কর্মরত স্থানীয় যুবক এইচ এম মনিরুল ইসলাম মনে করেন, নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তরুণদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারিত হলে গ্রামীণ যুবকদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জনের সুযোগও বাড়বে।
বেতাগী পৌর শহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আ. আজীজ হাওলাদার বলেন, ঈদ, পূজা ও বড়দিনসহ বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পোশাক কারখানাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ উদ্যোগ সম্প্রসারিত হলে ভবিষ্যতে এলাকায় সুতা, কাপড়, বোতাম, দর্জি সামগ্রী ও পোশাক তৈরির যন্ত্রাংশের বাজার গড়ে উঠতে পারে। এতে কারখানার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, ক্ষুদ্র পোশাকশিল্পের বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, আধুনিক সেলাই ও পোশাক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে স্বল্প সুদের ঋণ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উৎপাদিত পোশাকের মান উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা ও সাভারের পোশাক কারখানায় কাজের অভিজ্ঞতা থাকা দক্ষ শ্রমিক কিংবা উদ্যোক্তারা গ্রামে ফিরে অল্প পুঁজি নিয়ে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে উপকূলীয় এলাকায় ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হতে পারে। বড় শহরের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় কম রাখার সুযোগ কাজে লাগানো গেলে স্থানীয় বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক সরবরাহও বাড়তে পারে।
গ্রীন লিভ ফ্যাশনের উদ্যোক্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে কারখানাটিকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি মনে করেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বেতাগীর এ উদ্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ঘরের কাজ সামলে গ্রামীণ নারীরা বাড়ির কাছেই সম্মানজনকভাবে আয়ের সুযোগ পেলে তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। একই সঙ্গে কাজের সন্ধানে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে টেকসই উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
এই বাংলা/এমএস