রাজনীতির কঠিন চোরাস্রোতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে মানুষের সম্পর্কের সমীকরণও দ্রুত বদলে যায়। সামান্য চাপের মুখে বা স্বার্থের সামান্যতম সমীকরণে অনেকেই রাতারাতি রূপ পাল্টান, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দূরে সরে যান। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি বড় বাঁকে এমন কিছু মানুষের দেখা মেলে, যাঁদের ওপর দিয়ে শত ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেলেও বিশ্বাসের ভিত নড়ে না। টানা সাড়ে ১৭ বছরের সুদীর্ঘ বন্দিত্ব, দুঃসহ একাকীত্ব, ধারাবাহিক শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়েও সম্পর্কের মর্যাদা, রাজনৈতিক আদর্শ ও ব্যক্তিগত আনুগত্যে যিনি অবিচল থেকেছেন, তিনি গিয়াস উদ্দিন আল মামুন।
২০০৭ সালের ১/১১ পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক ডামাডোলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। এরপর একে একে পেরিয়ে গেছে একটি জীবনের প্রায় দেড় যুগ—ক্যালেন্ডারের হিসাবে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি দিন।
এই দীর্ঘ সময়ের ব্যপ্তি কতটা সুবিশাল, তা কেবল হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। যে সময়ে একটি সদ্যোজাত শিশু জন্ম নিয়ে ধীরে ধীরে শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ এক যুবক হয়ে ওঠে, একজন পিতা তাঁর সন্তানের প্রতিদিনের বেড়ে ওঠা ও সোনালী শৈশব দেখে তৃপ্ত হন, কোনো মানুষ নতুন করে তাঁর ক্যারিয়ার গড়ে কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ করে সমাজের শিখরে পৌঁছান—ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণগুলো মামুনের জীবন থেকে নিঃশব্দে শুষে নিয়েছে কারাগারের নির্মম, নিরেট ও ধূসর চার দেয়াল। অবশেষে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বন্দিদশার সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে মুক্ত আকাশের নিচে নিঃশ্বাস নেন তিনি।
১/১১ থেকে শুরু হওয়া মিডিয়া ট্রায়াল ও রাজনৈতিক সমীকরণ
গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ঘনিষ্ঠজন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, তাঁর এই দীর্ঘ কারাভোগ নিছক কোনো সাধারণ ফৌজদারি কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না। এটি ছিল মূলত এক গভীর রাজনৈতিক সমীকরণের করুণ পরিণতি। ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই তাঁকে রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হয়। ক্ষমতার পালাবদলের সেই সন্ধিক্ষণে বিএনপি পরিবার এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল করার অন্যতম কৌশল হিসেবে মামুনের নামটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে পতিত সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়জুড়ে সেই ধারা অব্যাহত থাকে এবং তা এক সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক গণমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র ‘মিডিয়া ট্রায়াল’। বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ও নীতিবাচক বিষয়ে মামুনকে কল্পিত সূত্র বানিয়ে নানা বানোয়াট ও মুখরোচক সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ভাবমূর্তি জনসমক্ষে ক্ষুণ্ন করা।
অথচ বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা আল মামুন এসবের কিছুই জানতেন না। দিনের পর দিন বন্দিশালায় অকথ্য মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করলেও, কারও বিরুদ্ধে যায় এমন একটি অসত্য কথাও তাঁর মুখ থেকে কেউ বের করতে পারেনি। মামুনের শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবসময় বলে এসেছেন, তিনি ছিলেন কেবল দলের একজন একনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত কর্মী। কোনো অনৈতিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক বা অর্থপাচারের ভিত্তিহীন অভিযোগের সাথে তাঁর কোনো বাস্তব সংযোগ ছিল না। তাঁর আইনজীবী জানান, মূলত বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবেই একে একে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ২২টি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
আদালতের কাঠগড়ায় সত্যের উন্মোচন
সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার পর দেশের উচ্চ আদালতে শুরু হয় মামুনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মামলাগুলোর চুলচেরা আইনি বিশ্লেষণ। যে অভিযোগগুলোর কারণে তাঁকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বছরগুলো কারাগারে কাটাতে হয়েছিল, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেসব অভিযোগের অন্তঃসারশূন্যতাই একের পর এক প্রমাণিত হতে থাকে।
দুর্নীতি মামলা থেকে অব্যাহতি: ২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট একটি কথিত দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া তিন বছরের সাজা বাতিল করে তাঁকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। আদালত পর্যালোচনায় দেখতে পান, মামলার নথিপত্রে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল তা সাক্ষ্য-প্রমাণে টেকে না।
সম্পদ অর্জনের মামলায় জয়: ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় হাইকোর্টের সাজা বাতিলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি বহাল রাখেন। একই রায়ের মাধ্যমে মামুনের স্ত্রী শাহিনা ইয়াসমিনের সাজাও বাতিল ঘোষণা করা হয়, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সামাজিক গ্লানি ও মিথ্যা অপবাদ থেকে এই দম্পতি আইনি মুক্তি লাভ করেন।
অর্থপাচার মামলার অবসান: বহুল আলোচিত অর্থপাচার মামলাতেও আসে সবচেয়ে বড় স্বস্তির রায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের সাত বছরের কারাদণ্ডের রায় পুরোপুরি বাতিল করে মামুনকে খালাস দেন। পরবর্তী সময়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগও এই খালাসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। রায়ে প্রতীয়মান হয় যে, মানি লন্ডারিংয়ের যে অভিযোগ বছরের পর বছর ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অস্ত্র মামলার রায় বাতিল: ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি বিতর্কিত অস্ত্র মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১০ বছরের সাজা বাতিল করে মামুনকে নির্দোষ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানান, রাষ্ট্রপক্ষ মামুনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

আইনজীবীদের জোরালো পর্যবেক্ষণ হলো, যেসব মামলায় একসময় তাঁকে বছরের পর বছর কারান্তরালে রাখা হয়েছিল, চূড়ান্ত বিচারে উচ্চ আদালত প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু আদালতের এই লিখিত রায় এবং সম্মানজনক খালাস কি কখনো ফিরিয়ে দিতে পারবে জীবনের হারিয়ে যাওয়া সেই অমূল্য সাড়ে ১৭টি বছর? ন্যায়বিচার হয়তো এসেছে, কিন্তু সেই বিচার এসেছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো কেড়ে নেওয়ার পর।
মাতৃহারা এক সন্তানের নীরব ক্রন্দন
গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের এই সুদীর্ঘ ও নিঃসঙ্গ বন্দিজীবনে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। যখন তাঁর মা মোসাম্মৎ হালিমা খাতুন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখনো মামুন ছিলেন কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠে। মমতাময়ী মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে থাকার, তাঁর মাথায় শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগই এই সন্তানের কপালে জোটেনি।
মায়ের শেষ বিদায়ে অংশ নেওয়া এবং জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। কারারক্ষীদের কঠোর নিরাপত্তা বলয় আর প্রহরীর ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে একজন সন্তানের মা হারানোর সেই কান্না কোনো আইনি নথিতে লেখা থাকে না। মায়ের নিথর দেহ একনজর ছুঁয়ে দেখার পরই তাঁকে আবার ফিরে যেতে হয়েছিল বন্দিশালার সেই পরিচিত অন্ধকার কুঠুরিতে। যে মানুষটি নিজের জীবনের বিনিময়েও আনুগত্য আর আদর্শ বিক্রি করেননি, মায়ের শেষ বিদায়েও তাঁর এই নির্মম ভাগ্যবরণ তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
অপেক্ষার অবসান ও ত্যাগের এক নতুন উপাখ্যান
সাড়ে ১৭ বছর পর কারাগারের লোহার দরজা পেরিয়ে যখন তিনি মুক্ত জীবনে পা রাখলেন, তখন তাঁর চারপাশের পৃথিবীটা পুরোপুরি বদলে গেছে। ঢাকার রাজপথ, পারিপার্শ্বিক রাজনীতি, মানুষের চিন্তাচেতনা এবং জীবনের চেনা বাস্তবতা অনেকটাই রূপান্তর হয়েছে। সময়ের নির্মম কষাঘাতে বয়সের রেখা স্পষ্ট হয়েছে চেহারায়, স্বাস্থ্য ও শারীরিক শক্তিতে এসেছে স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু এত কিছুর পরও যে বিষয়টি একবিন্দুও বদলায়নি, তা হলো তাঁর বিশ্বাসের দৃঢ়তা এবং দলের প্রতি অটল ভালোবাসা।
রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার লোভ, দলবদল আর মোসাহেবির বহু উদাহরণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু ঘোর দুঃসময়ে, প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যেও কারও প্রতি বিশ্বস্ততা অটুট রাখার ইতিহাস খুব বেশি চোখে পড়ে না। মামলা হয়েছে, মানহানির চেষ্টা হয়েছে, জেলখানার গুমোট অন্ধকারের মাঝে যৌবন হারিয়ে গেছে—কিন্তু কোনো চক্রান্তই তাঁকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একচুল নড়াতে পারেনি। এ কারণেই রাজনৈতিক অঙ্গন এবং দলের নেতাকর্মীদের কাছে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নাম নন; তিনি এক পরীক্ষিত, সাহসী এবং অটল সৈনিকের জীবন্ত প্রতীক।
একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো কোনো শীতল আদালতের এজলাসে কিংবা কাঠের কাঠগড়ায় অনুষ্ঠিত হয় না। সেই পরীক্ষাগুলো নীরবে সম্পন্ন হয় দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার ভেতর, বছরের পর বছর অপেক্ষার প্রহরে আর দুঃসময়ে নিজের বিশ্বস্ত অবস্থান আঁকড়ে ধরে রাখার সুকঠিন লড়াইয়ের মাধ্যমে। সেই কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন আজ কেবল একজন কারামুক্ত নাগরিক নন; তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম ত্যাগ, অসীম ধৈর্য এবং প্রশ্নাতীত বিশ্বস্ততার এক অশ্রুসজল ও চিরস্মরণীয় উপাখ্যান।
এই বাংলা/এমএস