সুলতানি থেকে ব্রিটিশ আমল: চট্টগ্রামের ১০৫ স্থাপনা যাচ্ছে সংরক্ষণ তালিকায়
এইবাংলা অনলাইন
প্রকাশকালঃ
মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :
নগরায়নের চাপ, অবহেলা ও সময়ের নির্মম আঘাতে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে বড় উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নতুন মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যানের আওতায় নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় অবস্থিত ১০৫টিরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থাপনা সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটন বিকাশ, ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ৫৩টি এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৫২টির বেশি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ, জমিদারবাড়ি, সেতু, বাতিঘর, পুরোনো সরকারি ভবনসহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মাস্টার প্ল্যান প্রকল্প কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু ইসা আনসারী বলেন, চট্টগ্রাম শুধু দেশের প্রধান বন্দরনগরী নয়, বরং হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের ধারক। দ্রুত নগরায়ন, অব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বাস্তবতায় ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য স্থানসমূহ শনাক্তকরণ ও সংরক্ষণ’ শীর্ষক একটি ওয়ার্কিং পেপার প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে ঐতিহাসিক গুরুত্ব, স্থাপনার স্থায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক মূল্য বিবেচনায় সংরক্ষণযোগ্য স্থাপনাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
তালিকাভুক্ত উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৩১ বছরের পুরোনো হাতির বাংলো, ১৮৭২ সালে নির্মিত সিআরবি ভবন, কোর্ট বিল্ডিং, ওয়ালি বেগ খাঁ জামে মসজিদ, লালদীঘি ময়দান, পুরোনো সার্কিট হাউস (বর্তমান জিয়া স্মৃতি জাদুঘর), সিআরবি শিরীষতলা, কালুরঘাট সেতু, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব, চন্দনপুরা মসজিদ ও বদর আউলিয়ার দরগাহ। এছাড়া আন্দরকিল্লা, পাঠানটুলী, চকবাজার, পাহাড়তলী, চান্দগাঁও ও কাতালগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদ, মাজার, মঠ এবং রেলওয়ের পুরোনো স্থাপনাও সংরক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
শহরের বাইরে তালিকাভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারীর ওলি খান মসজিদ, হামজা খান মসজিদ, নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহের দিঘি ও মসজিদ, ফতেয়াবাদ পরিত্যক্ত কাছারি, হাটহাজারী বিমানঘাঁটি, আনোয়ারার নরমান্স পয়েন্ট লাইটহাউস, পরৈকোড়া বৌদ্ধ মন্দির, দেয়াং পাহাড়, প্রসন্ন কুমার রায় জমিদারবাড়ি এবং বন্দরগ্রাম বাতিঘর। এছাড়া রাউজানের কদলপুর মসজিদ, সাহেব বিবি জামে মসজিদ, জগৎপুর মন্দির, মাস্টারদা সূর্য সেন স্মৃতিস্তম্ভ, রাঙ্গুনিয়ায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রথম মাজার, চাকমা রাজবাড়ি, বোয়ালখালীর সূর্য সেন স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও জমিদারবাড়ি, সীতাকুণ্ডের কুমিরা হাম্মাদিয়া মসজিদ, উত্তর সলিমপুর বিষ্ণু মন্দির এবং জাফরনগর চৌধুরী বাড়িসহ বিভিন্ন উপজেলার ঐতিহাসিক স্থাপনাও রয়েছে।
প্রকৌশলী আবু ইসা আনসারী বলেন, এই উদ্যোগ কেবল স্থাপনা সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শিক্ষা, পর্যটন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে একদিকে যেমন সংস্কৃতি সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হবে।
তিনি আরও জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুসরণ করে সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্থাপনাগুলোর তথ্যচিত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে ভাগাভাগি করা হবে, যাতে সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যায়।
সিডিএ কর্মকর্তারা জানান, মাস্টার প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে তালিকাভুক্ত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দখল বা ধ্বংসের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংরক্ষণ, সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোহাম্মদ শাহজাহান খান,
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক ১২, পুরানা পল্টন (এল মল্লিক কমপ্লেক্স, ৫ম তলা) ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত ও আর এস প্রিন্টিং প্রেস ৯২, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।