উত্তরের জনপদে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস ও লোককথার ভাণ্ডারে সিন্দুরমতি দিঘি একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। বিশাল জলরাশি, প্রাচীন বটগাছ, বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা এবং শত বছরের লোককথাকে ঘিরে লালমনিরহাটের এই দিঘিটি স্থানীয়দের কাছে ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিনের অবহেলার পর বর্তমানে সংস্কারকাজের মাধ্যমে দিঘিটির পুরোনো পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়ন ও কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত সিন্দুরমতি দিঘির আয়তন প্রায় ১৬ দশমিক ৫ একর। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, দিঘিটি প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ বছর আগে খনন করা হয়েছিল। তবে এর সঠিক নির্মাণকাল ও ইতিহাস নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
দিঘির নামকরণ নিয়ে লোককথা
সিন্দুরমতি দিঘিকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে একটি লোককথা প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, শ্রীলঙ্কা থেকে আসা হিন্দু জমিদার রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী এলাকার মানুষের পানির সংকট দূর করতে একটি বিশাল দিঘি খননের উদ্যোগ নেন। কিন্তু খনন শেষ হওয়ার পরও দিঘিতে পানি ওঠেনি।
লোককথা অনুযায়ী, পরে এক রাতে তিনি স্বপ্নাদেশ পান—তাঁর দুই কন্যা সিন্দুর ও মতিকে দিঘির মাঝখানে বসিয়ে পূজা করতে হবে। সেই অনুযায়ী পূজার আয়োজন করা হয়। পূজার একপর্যায়ে প্রয়োজনীয় উপাচার আনতে জমিদার দিঘির পাড়ে উঠে আসেন। তখন দিঘির তলদেশ থেকে প্রবল বেগে পানি উঠতে শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দিঘিটি পানিতে পূর্ণ হয়ে যায়। এ সময় তাঁর দুই কন্যা সিন্দুর ও মতি পানিতে তলিয়ে যান বলে লোককথায় বর্ণনা করা হয়।
দুই কন্যার নাম অনুসারেই দিঘিটির নাম ‘সিন্দুরমতি’ হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়।
ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
সিন্দুরমতি দিঘির চারপাশে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন বটবৃক্ষ ও ধর্মীয় স্থাপনা। এখানে রাম মন্দির, কালী মন্দির, শিব মন্দির, দুর্গা মন্দির, রাধা-কৃষ্ণ মন্দির, বিশ্বকর্মা মন্দির, গণেশ মন্দির, ভোলানাথ মন্দির, বুড়ি মন্দির, ইসকন মন্দির ও শ্মশান কালী মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মন্দির ও দিঘিকে ঘিরে নিয়মিত পূজা, ধর্মীয় আচার, প্রতিমা বিসর্জন এবং সৎকারের মতো কার্যক্রম হয়ে থাকে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সিন্দুরমতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসেবেও পরিচিত।
প্রতিবছর চৈত্র মাসে এখানে সিন্দুরমতি মেলা বসে। মেলা ও পূণ্যস্নানকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের সমাগম হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিবেশী ভারত ও নেপাল থেকেও পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা এখানে আসেন।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
সিন্দুরমতির সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক নানা তথ্যও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। ১৯৭৫ সালে দিঘি সংস্কারের সময় তলদেশ থেকে প্রাচীন মূর্তি ও মূল্যবান মুদ্রা উদ্ধারের কথা জানা যায়। এসব নিদর্শনের কিছু জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে খননকাজের সময় প্রাচীন নিদর্শন ও ইটের তৈরি ঘাটের সন্ধান পাওয়ার কথাও স্থানীয়ভাবে বলা হয়েছে। তবে এসব নিদর্শনের সময়কাল ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে যাচাই প্রয়োজন।
সংস্কারে ফিরছে পুরোনো রূপ
দীর্ঘদিনের অযত্ন ও পলি জমে সিন্দুরমতি দিঘিটি ধীরে ধীরে ভরাট হওয়ার পথে ছিল। এতে দিঘির পানি ধারণক্ষমতা কমার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মেলার আয়োজনেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছিল।
বর্তমানে বড় ধরনের সংস্কারকাজের মাধ্যমে দিঘিটির পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দিঘির খননকাজ শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বর্তমানে দিঘির পাড় উঁচু করা, চারপাশে ঢালাই পথ নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, আধুনিক স্নানঘাট ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ চলছে।
ভবিষ্যতে সিন্দুরমতিকে ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
সংস্কারকাজ শেষ হলে সিন্দুরমতি দিঘি স্থানীয় পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। বিশাল জলরাশি, প্রাচীন বৃক্ষ, মন্দির, দিঘিপাড়ের পরিবেশ এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোককথা—সব মিলিয়ে স্থানটি উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সিন্দুরমতির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব আরও সুস্পষ্ট করতে এর বয়স, উদ্ধার হওয়া নিদর্শন এবং পুরোনো স্থাপনাগুলো নিয়ে প্রামাণ্য গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম প্রয়োজন। একই সঙ্গে উন্নয়নকাজের সময় দিঘিটির ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
এই বাংলা/এমএস