শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:২৭ অপরাহ্ন

২০ বছর ধরে ‘চিকিৎসক’ পরিচয়ে রোগী দেখছেন, নেই এমবিবিএস বা নিবন্ধন

স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ
  • প্রকাশকালঃ শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

কিশোরগঞ্জের ইটনা সদরে কোনো এমবিবিএস ডিগ্রি, চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন কিংবা প্রয়োজনীয় সনদ ছাড়াই প্রায় ২০ বছর ধরে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখার অভিযোগ উঠেছে মো. আবুল কাশেম নামে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটনা সদরে নিজস্ব চেম্বার খুলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু থেকে বৃদ্ধ—বিভিন্ন বয়সী রোগী দেখেন তিনি। রোগীপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভিজিট নিয়ে ওষুধের পরামর্শ ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ওই চেম্বারে গিয়ে রোগীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। রোগীদের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আবুল কাশেম সাদা কাগজে ওষুধের নাম লিখে দিচ্ছেন। ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকের সিল বা স্বাক্ষরও নেই। নাক-কান-গলা ও চোখের বিভিন্ন সমস্যায়ও তিনি রোগী দেখছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবুল কাশেম একসময় ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, চাকরির সময় থেকেই তিনি ওই চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখা অব্যাহত রেখেছেন।

কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, তার কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর কারও কারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল কিংবা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এদিকে হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশ ও কমিশন লেনদেনের মাধ্যমে তিনি রোগী দেখার সুযোগ পাচ্ছেন—এমন অভিযোগও স্থানীয়দের কেউ কেউ করেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে মো. আবুল কাশেম বলেন, “আমি ২০ বছর ধরে এভাবে চিকিৎসা দিয়ে আসছি। আমি ইন্টার পাস। আমার কোনো সনদ নেই।”

তিনি আরও বলেন, “আমি ওষুধ লেখার ক্ষমতা রাখি না। আমি যে কাজটি করছি, সেটি আইনত অপরাধ।”

রোগীদের সরকারি হাসপাতালে রেফার করার বিষয়ে তিনি জানান, তিনি মৌখিকভাবে পরামর্শ দিলে সরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি নেওয়া হয়।

ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আতিশ দাস রাজীব বলেন, আবুল কাশেম দীর্ঘদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইটনায় চিকিৎসক সংকট থাকায় রোগীরা তার কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে চাকরির অভিজ্ঞতা চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখা কিংবা ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার বৈধ অনুমতি দেয় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

কিশোরগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. নাজমুল করিম বলেন, “আপনাদের মাধ্যমে জেলার ইটনায় একজন সনদবিহীন ডাক্তারের সন্ধান পেয়েছি। তিনি ডাক্তার না হয়ে রোগী দেখছেন অথবা প্রেসক্রিপশন লিখছেন—এ ধরনের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রায় দুই দশক ধরে একজন ব্যক্তি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-যোগ্যতা ও নিবন্ধন ছাড়াই প্রকাশ্যে রোগী দেখে আসার বিষয়টি এতদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এল না কেন?

সচেতন মহলের মতে, চিকিৎসা একটি সংবেদনশীল পেশা। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও নিবন্ধন ছাড়া কেউ চিকিৎসা দিলে রোগীর স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর