কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের স্বল্পমারিয়া গ্রামে ওয়ারিশান সনদ ও দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা এবং বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শেখ ফরিদ, রাজিবসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ এবং আদালতে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী মো. বাবুল মিয়া।
বাবুল মিয়ার অভিযোগ, গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) স্বল্পমারিয়া গ্রামে তার বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় তিনি কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর ওয়ারিশান সনদ ও দলিল জালিয়াতির অভিযোগে আদালতে ৫৮২/২৬ নম্বর মামলা করেন তিনি।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পমারিয়া মৌজার একটি জমির মূল মালিক শুক্কুর জান মৃত্যুকালে তিন ছেলে ও দুই মেয়েসহ পাঁচজন ওয়ারিশ রেখে যান। ওয়ারিশরা হলেন—মরহুম মো. রুস্তম আলী, মো. হোসেন, মরহুম মো. ইদ্রিস আলী, কমলা খাতুন ও বেদেনা খাতুন। ৬৭৬ নম্বর আরএস দাগের ১৮ শতাংশ জমি তারা ওয়ারিশসূত্রে যৌথভাবে ভোগদখল করে আসছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ওই জমিতে তিন ছেলের প্রত্যেকে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং দুই মেয়ের প্রত্যেকে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ করে অংশ পাওয়ার কথা। পরবর্তী সময়ে শুক্কুর জানের মেয়ে বেদেনা খাতুন ১৯৯২ সালে সাফকাওলা দলিলের মাধ্যমে স্বল্পমারিয়া মৌজার ৬৭৮ নম্বর হাল দাগের ৮ শতাংশ ৩২ পয়েন্ট জমি নূরুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. ছাফিয়া খাতুনের কাছে বিক্রি করেন। পরে ২০০২ সালের ১৫ জানুয়ারি ছাফিয়া খাতুন ওই জমি শেখ ফরিদ আহমেদের কাছে বিক্রি করেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, পরবর্তীতে প্রকৃত তথ্য গোপন করে শুক্কুর জানের নামে একটি ওয়ারিশান সনদ তৈরি করা হয়। সেখানে তিন ছেলের ওয়ারিশান তথ্য বাদ দিয়ে শুধু দুই মেয়ে কমলা খাতুন ও বেদেনা খাতুনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখের ২০২৫/২৮৭ নম্বর স্মারকের ওয়ারিশান সনদে মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আব্দুল্লাহ আল হারুনের সিল ও স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ৬৭৮ নম্বর হাল দাগের পরিবর্তে ৬৭৬ নম্বর দাগ উল্লেখ করে ওই কাগজপত্রের ভিত্তিতে শেখ ফরিদ কিশোরগঞ্জ সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে ২০২৬-১০০০০১৯ নম্বর খারিজা নামজারি খতিয়ান করেন। পরে শেখ ফরিদ ও রাজিবের নেতৃত্বে ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে ৪৪৭০ নম্বর সাফকাওলা দলিলের মাধ্যমে জমিটি বিক্রি করে দেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী মো. বাবুল মিয়া বলেন, “মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ারিশান সনদ জাল করে মো. রাজিবের নেতৃত্বে একদল লোক আমার বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এ কারণে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
অভিযোগের বিষয়ে রাজিব বলেন, “ভুলক্রমে ইনডেক্সে ৬৭৮ নম্বরের স্থলে ৬৭৬ নম্বর দাগ বসানো হয়েছে। বিষয়টি সংশোধনের জন্য আমরা মামলা করেছি।” তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মামলার কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
অভিযুক্ত শেখ ফরিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ওয়ারিশান সনদ জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত রেকর্ডে পাঁচজনের নাম উল্লেখ রয়েছে। পরে জানতে পারি, সেখানে মাত্র দুইজনের নাম উল্লেখ করে একটি ওয়ারিশান সনদ তৈরি করা হয়েছে। ওই সনদের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত রেকর্ডের কোনো মিল নেই।”
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ আবুল কালাম ভূইয়া বলেন, “স্বল্পমারিয়া এলাকায় বাড়িঘর ভাঙচুরের বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে জমির মালিকানা, দলিল ও ওয়ারিশান সনদ জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট নথির বৈধতা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
এই বাংলা/এমএস