বিশেষ প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় নন-লাইফ বীমা ও পুনঃবীমা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি)। ২০২৪ সালে প্রকাশিত সিএজির (CAG) অডিট রিপোর্ট এবং ২০২৫ সালের সদ্য উন্মোচিত স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিবেদন (Audited Financial Statements) বিশ্লেষণ করে যে চিত্রটি সামনে এসেছে, তা কোনো সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম নয়। এটি অত্যন্ত ধুরন্ধর ও সুকৌশলী মাস্টারমাইন্ডদের পরিচালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন — হিসাববিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’বলা হয়ে থাকে।
নথিপত্র ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই মেগা দুর্নীতির যে চারটি প্রধান স্তর উন্মোচিত হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
এফডিআরের কৃষ্ণগহ্বর: খাতা বনাম বাস্তবতার ফারাক
যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও তরল সম্পদ ধরা হয় ব্যাংকে গচ্ছিত ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডিআর (FDR)-কে। কিন্তু সাধারণ বীমার ২০২৪ সালের ব্যালেন্স শিটের ‘Note-16’-এ চোখ রাখলে যেকোনো ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট চমকে উঠতে বাধ্য।
খাতা-কলমে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে, বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের এফডিআরের ব্যালেন্স রয়েছে ৯০৪ কোটি টাকা। কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর অনুসন্ধানী মডেলে দেখা যায়, স্বাধীন অডিটররা যখন সরাসরি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে থার্ড-পার্টি কনফার্মেশন (Third-Party Confirmation) তলব করেন, তখন মিলেছে মাত্র ৫১৮ কোটি টাকার প্রকৃত হিসাব।
মাঝখান থেকে প্রায় ৩৮৬ কোটি টাকা পুরোপুরি গায়েব। হিসাববিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে স্রেফ কোনো ‘ক্লারিকাল ভুল’ বলার সুযোগ নেই। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মেগা চুরিকে ধামাচাপা দিতে সাজানো হয়েছে আলামত নষ্টের এক নিখুঁত নাটক। অডিটরদের ভেরিফিকেশন এড়াতে ১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মূল এফডিআর সার্টিফিকেট গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। এবং বাকি ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস “হারিয়ে গেছে” দাবি করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (GD) করা হয়েছে — যা অপরাধের আইনি ট্রেইল মুছে ফেলার একটি সুপরিচিত কৌশল।
বিনিয়োগের আড়ালে ধোঁয়াশা: দ্য স্মোকস্ক্রিন ট্যাকটিক
এই ৩৮৬ কোটি টাকা আত্মসাৎকারীরা ফিন্যান্সিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মোটেও কাঁচা নন। এত বড় অঙ্কের তহবিল সরালে যেন কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক অ্যালার্ম বা সন্দেহ তৈরি না হয়, সেজন্য তারা অত্যন্ত সুকৌশলে একটি ‘স্মোকস্ক্রিন’ বা ধোঁয়াশা তৈরি করেছিলেন।
২০২৪ সালে তারা তড়িঘড়ি করে ৯৭৭ কোটি টাকার এফডিআর নগদায়ন (Liquidate) করেন। এরপর সেই অর্থ স্থানান্তর করেন শতভাগ নিরাপদ ‘বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ড ও বিলে’।
সরকারি বন্ডে এই বিপুল বিনিয়োগ থেকে তারা ১১.৪২% থেকে ১২.৪৫% পর্যন্ত উচ্চ মুনাফা বা সুদ তুলে নিচ্ছেন। একদিকে তারা এই উচ্চ আয় দেখিয়ে নিজেদের ‘হিসেবে পাকা’ ও দক্ষ তহবিল ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচালনা পর্ষদের কাছে প্রমাণ করেছেন; অন্যদিকে এই অতি-নিরাপদ বৈধ বিনিয়োগের আড়ালে ব্যাংকের খাতা থেকে ৩৮৬ কোটি টাকা চুরির ঘটনাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে আড়াল করতে সক্ষম হয়েছেন। একেই বলে “লুকানোর জন্য আলোর ব্যবহার”।
বেসরকারি কোম্পানির কাছে জিম্মি ১৩৩৪ কোটি টাকা
সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের আয়ের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান উৎস হলো ‘পুনঃবীমা’ (Re-insurance)। সিএজি ও স্বাধীন অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলো সাধারণ বীমার কাছ থেকে বড় বড় ঝুঁকির বিপরীতে কভারেজ নিলেও, বছরের পর বছর তার প্রিমিয়াম পরিশোধ করছে না।
পূর্বের অডিটে যেখানে ৮৮২ কোটি টাকার পাওনা ঝুলে ছিল, সেখানে নতুন করে আরও ২৩৮ কোটি ৫৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা অনাদায়ী হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের ব্যালেন্স শিটের ‘Note 20.00’ অনুযায়ী, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে এই বকেয়ার পাহাড় জ্যামিতিক হারে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ১,৩৩৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ১,৪০১ কোটি টাকা মোট পাওনার বিপরীতে ২০২৪ সালে পুরো বছরে আদায় করা হয়েছে মাত্র ৬৬.৬৮ কোটি টাকা — যা মোট পাওনার মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি সুকৌশলে জনগণের হাজার কোটি টাকা বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ “বিনা সুদে” মূলধন হিসেবে ব্যবহার করার অনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে, যার বিপরীতে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
রক্ষক যখন ভক্ষক: অভ্যন্তরীণ লুণ্ঠন ও সম্পদের অরাজকতা
শীর্ষ স্তরের এই হাজার কোটি টাকার জিয়ালিয়তির সমান্তরালে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় চরম অরাজকতা ও হরিলুট চলেছে। যাদের কাঁধে এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব ছিল, তারা নিজেরাই মেতে উঠেছেন সরকারি অর্থ আত্মসাতের উৎসবে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
বেতন স্কেলের জালিয়াতি: সিএজি রিপোর্টের অনুচ্ছেদ-০২ অনুযায়ী, ‘জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫’ এবং অর্থ বিভাগের স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে কিছু ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তা মূল বেতনের সাথে দুটি পৃথক অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট যোগ করে সরকারের ৪ কোটি ১৮ লাখ ৮২ gold হাজার ০৬৩ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই নজিরবিহীন জালিয়াতির ফলে ৩য় গ্রেডের অনেক কর্মকর্তা ১ম গ্রেডের (সিনিয়র সচিব সমমর্যাদার) কর্মকর্তাদের চেয়েও বেশি বেতন তুলে নিয়েছেন।
লাঞ্চ ভাতা কেলেঙ্কারি: অডিট রিপোর্টের অনুচ্ছেদ-০৩ বলছে, কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কর্মকর্তারা অবৈধভাবে আরও ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৯৬ হাজার ২০০ টাকা ‘লাঞ্চ সাবসিডি’ বা খাবার ভাতা হিসেবে নিজেদের পকেটে ভরেছেন, যা অডিটরদের তীব্র আপত্তির পরও কোষাগারে ফেরত আনা হয়নি।
রিয়েল এস্টেট ও উধাও স্থায়ী সম্পদ: সাধারণ বীমার নিজস্ব বাণিজ্যিক ভবনগুলোর (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী) ব্যবস্থাপনাতেও মিলেছে চরম অনিয়ম। চুক্তি অমান্য করে ভাড়া এবং ইউটিলিটি বিল বাবদ ১১ কোটি ৯৫ লাখ ৭১ লাখ ১৮৮ টাকা আদায় করা হয়নি। ২০২৪ সালের অডিটেও ভাড়ার খাতে ৪.৭১ কোটি টাকার গরমিল বা ‘unreconciled variance’ পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ২০২৪ সালের স্বাধীন অডিটররা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, কর্পোরেশনের ১৬৬ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদের (Fixed Asset) কোনো বৈধ রেজিস্টার বা সঠিক ভৌত হিসাব কর্তৃপক্ষ দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এই নথিপত্র এবং ফিন্যান্সিয়াল বিশ্লেষণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের ভেতরে অত্যন্ত ধুরন্ধর ও হিসাববিজ্ঞানে পারদর্শী একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয়।
এই জালিয়াতির চক্রটি আর্থিক নথিপত্র ও লেজার ম্যানিপুলেশনে অত্যন্ত দক্ষ, তাই সাধারণ কোনো প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি দিয়ে এই সিন্ডিকেট দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা বা চুরি যাওয়া ৩৮৬ কোটি টাকার শেষ গন্তব্য বের করা সম্ভব নয়। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কোনো বেনামি অ্যাকাউন্টে বা বিদেশে পাচার (Money Laundering) হয়েছে কিনা, তা উদঘাটনে অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU) যৌথ সমন্বয়ে একটি উচ্চতর ‘ফরেনসিক অডিট’ (Forensic Audit) পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি।
জড়িতদের অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতার আওতায় আনা না গেলে, রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির কঙ্কাল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এ বিষয়ে সাধারন বীমার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে কেউ কথা বলতে রাজি হন নি।