কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চর বিদ্যানন্দ। চারদিকে নদী, মাঝখানে বিস্তীর্ণ চর। বর্ষায় পানির সঙ্গে যুদ্ধ, শুষ্ক মৌসুমে বালুচরে ফসল ফলানোর লড়াই। এই চরের কৃষকদের স্বপ্ন—জমিতে ধান ফলিয়ে সংসার চালানো। তবে ডিজেলের দাম বাড়ায় সেই ফসল ঘরে তোলা নিয়েই এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
চরের জমিগুলোতে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই বৈদ্যুতিক মোটর। সেচের জন্য তাই কৃষকদের একমাত্র ভরসা স্যালো মেশিন। কিন্তু ডিজেলের দাম বাড়ায় সেটি চালানোর খরচও বেড়েছে। অনেক কৃষক ধানের শীষ আসতে শুরু করলেও সেচের জন্য তেল কেনার টাকা জোগাড় করতে পারছেন না।
চর বিদ্যানন্দ গ্রামের কৃষক মো. মনসুর আলী (৫০) বছরের পর বছর স্যালো মেশিন দিয়ে চরে আমন আবাদ করে আসছেন। কৃষিকাজের আয়েই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলে তার সংসার।
মনসুর আলীর হিসাবে, আমন মৌসুমে সেচে প্রায় এক ব্যারেল ডিজেল লাগে। খরা মৌসুমে প্রয়োজন হয় প্রায় দুই ব্যারেল। এক ব্যারেলে প্রায় ১৫৯ লিটার তেল ধরে। আগে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থাকায় এক ব্যারেলের দাম পড়ত ১৮ হাজার ২৮৫ টাকা। এখন লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা হওয়ায় একই পরিমাণ ডিজেলের দাম প্রায় ২১ হাজার ৪৬৫ টাকা। অর্থাৎ এক ব্যারেলেই বাড়তি খরচ ৩ হাজার ১৮০ টাকা।
মনসুর আলী বলেন, ‘চরের জমিতে বিদ্যুৎ নেই, মোটর নেই। স্যালো মেশিনই একমাত্র ভরসা। পকেটে টাকা নেই, তাই মেশিন বাড়িতে এনে রেখেছি। তেল কিনব কী দিয়ে?’
ধানের শীষ আসতে শুরু করায় তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন পানি না দিতে পারলে এতদিনের আবাদই গচ্ছা যাবে। তেল না কিনতে পারলে সেচ দেব কীভাবে?’
শুধু সেচ নয়, চরজীবনের বাড়তি যাতায়াত ব্যয়ও কৃষকদের চাপে ফেলছে। মনসুর আলী জানান, নদী পারাপারে নৌকাই প্রধান ভরসা। যাতায়াত ও পকেট খরচ মিলিয়ে প্রায় ৪০০ টাকা চলে যায়। অনেক সময় ফেরার নৌকা না পেয়ে রাতেও চরে থাকতে হয়। তখন বাড়তি হয় থাকা-খাওয়ার খরচ।
ডিজেলের দাম বাড়ায় নৌকা ভাড়া, সেচ, সার-বীজ ও ফসল পরিবহনের খরচ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তার। তার ভাষ্য, ‘তেলের দাম বাড়ছে। নৌকার ভাড়াও বাড়বে। সেচের খরচ বাড়বে। সার আনতেও নদীর ওপারে যেতে হয়। আমরা কৃষকরা যাব কোথায়?’
হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কষ্ট করে চাষ করি। ফসল ফলিয়ে যদি খরচই তুলতে না পারি, তাহলে আবাদ করে লাভ কী? এভাবে দাম বাড়তে থাকলে চরের মানুষ আর আবাদ করতে পারবে না।’
চর বিদ্যানন্দের আরেক কৃষক মো. খলিলুর রহমান বলেন, ‘চরে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌকা। তেলের দাম বাড়লে নৌকার ভাড়াও বাড়তে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। সেচ, সার-বীজ আনাসহ সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে। তাহলে কৃষক যাবে কোথায়?’
এদিকে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি বাড়ছে সেচ ব্যয়। খরা মৌসুমে দুই ব্যারেল পর্যন্ত ডিজেল ব্যবহার করা কৃষকের বাড়তি চাপ আরও বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে নৌকা ভাড়া, সার-বীজ পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও ফসল পরিবহনের খরচ যোগ হলে জমিতে ধান ওঠার আগেই কৃষকের ব্যয়ের অঙ্ক বড় হয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি রায় বলেন, ‘জ্বালানির দামের বিষয়টি আমাদের নয়। এটা সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। ভর্তুকির ব্যবস্থা নেই। তবে কৃষিতে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। সাময়িক কষ্ট হবে তো হবেই। জ্বালানির দাম কমলে কষ্ট লাঘব হবে।’
এই বাংলা/এমএস