সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দৌলতপুরে ২৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষকের ৭৭ পদও শূন্য

দৌলতপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা তীব্র জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টিতে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। ৪৫টি বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষকের কাজ করছেন। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের ৭৭টি পদও শূন্য রয়েছে। এর বড় অংশই দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে।

বর্তমানে ৪৫টি বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্ব এবং ২৬টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বাড়তি প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়েছে।

শুধু বিদ্যালয় নয়, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও রয়েছে জনবল সংকট। অনুমোদিত ১০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার চারটি পদের মধ্যে দুটি শূন্য। এছাড়া সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর ও উচ্চমান সহকারী-কাম-হিসাবরক্ষকসহ আরও চারটি পদ খালি রয়েছে।

জনবল সংকটের কারণে বিদ্যালয় পরিদর্শন, প্রশাসনিক তদারকি ও নিয়মিত মনিটরিংয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। একই সঙ্গে শিক্ষক স্বল্পতায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।

বিশেষ করে যমুনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে সংকট আরও প্রকট। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, যাতায়াতের দুর্ভোগ, আবাসন সমস্যা ও দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক। বর্ষা মৌসুমে নৌপথনির্ভর যোগাযোগের কারণে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

২৯ নম্বর চরভারেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে সাতজন শিক্ষকের মধ্যে তিনজন কর্মরত আছি। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত শিক্ষক পদায়ন না দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

চরাঞ্চলের আরও কয়েকটি বিদ্যালয়েও একই চিত্র। ৩০ নম্বর যদুদূর্গাপুরে পাঁচটি, ৬১ নম্বর দক্ষিণ চরভারেঙ্গায় চারটি, ৩১ নম্বর যমুনা চরকাটারীতে চারটি, ৫ নম্বর বাঘুটিয়ায় পাঁচটি, ৩৩ নম্বর চরকাটারীতে চারটি এবং ৫৪ নম্বর চরকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনটি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চলে দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ যাতায়াত সুবিধা বা দুর্গম এলাকার ভাতা না থাকায় তাদের বাড়তি আর্থিক চাপ নিতে হচ্ছে। দীর্ঘ নৌপথ ও দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে শারীরিক ভোগান্তিও পোহাতে হয়। দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে অনেক সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

৮০ নম্বর চরকাটারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘চরাঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার জন্য সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চর অঞ্চলে পদায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।’ একই সঙ্গে দ্রুত চরভাতা বাস্তবায়নের দাবিও জানান তিনি।

সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, এক-দুজন শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পুরো বিদ্যালয়ের পাঠদান চালানো হচ্ছে। প্রধান ও সহকারী শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজের অতিরিক্ত চাপেও স্বাভাবিক শিখন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক ও স্থানীয় অভিভাবকেরা দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি এবং নতুন সহকারী শিক্ষক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়নের দাবি জানিয়েছেন।

দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর ফিরোজ বলেন, অবসর, বদলি, মৃত্যু ও মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদগুলো শূন্য হয়েছে। শূন্য পদের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। শিক্ষা অফিসের শূন্য পদগুলোর বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, চরাঞ্চলে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নতুন শিক্ষক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়নের দাবি জানানো হয়েছে। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর