শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রবেশ নিষেধাজ্ঞায় প্রাণ ফিরেছে সুন্দরবনে, বেড়েছে বাঘ-হরিণের অবাধ বিচরণ

এইবাংলা অনলাইন
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

বাগেরহাট প্রতিনিধি :

প্রতি বছর জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক, জেলে ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় বনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মানুষের কোলাহল ও হস্তক্ষেপ কমে যাওয়ায় বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ বেড়েছে। একই সঙ্গে নদী-খালে মাছের প্রজননের জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সাধারণ প্রবেশ এবং পাস-পারমিট প্রদান বন্ধ থাকে। এই সময়ে বাঘ, হরিণ, পাখিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নির্বিঘ্নে চলাচল ও প্রজননের সুযোগ পায়। পাশাপাশি নদী ও খালে মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে, যা মৎস্যসম্পদের বংশবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সময় বন বিভাগ অবৈধ শিকার ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চালায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানিতে নদী ও খালের লবণাক্ততা কমেছে। ফলে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ বেড়েছে, যা বনরক্ষীদের পর্যবেক্ষণ এবং ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ছে।

গত জুলাই মাসে সুন্দরবনের অন্তত পাঁচটি এলাকায় আটটি বাঘের দেখা মিলেছে। এর মধ্যে ১৫ জুলাই বিকেলে টহলরত বনকর্মীরা একসঙ্গে তিনটি বাঘকে নদী পার হতে দেখেন। পরে ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক এলাকায় একটি বাঘ এবং ২৬ জুলাই শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য সংলগ্ন টাইগার পয়েন্টে আরেকটি বাঘকে নদী সাঁতরে পার হতে দেখা যায়। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।

বন বিভাগ সম্প্রতি আন্ধারমানিক ও হাড়বাড়িয়া এলাকায় নতুন ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপন করেছে। হরিণ শিকারিদের ফাঁদে আহত হয়ে চিকিৎসার পর বনে ছেড়ে দেওয়া একটি বাঘিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এসব ক্যামেরা বসানো হয়। ক্যামেরা স্থাপনের পর ১৪ ও ২৪ জুলাই সেখানে তিনটি বাঘের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

২০২৪ সালে বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালে বন বিভাগ ও আইইউসিএনের যৌথ জরিপে সুন্দরবনে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। বনকর্মীদের মতে, হরিণের সংখ্যা ও চলাচল বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাঘের উপস্থিতিও বৃদ্ধি পায়।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, জুন থেকে আগস্ট সময়টি সুন্দরবনের নদী-খালের মাছ এবং বন্যপ্রাণীর প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। এ কারণেই ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর এ সময় সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখা হচ্ছে। এবারও সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর রয়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, গত এক বছরে বন পাহারার জন্য ফুট ট্রেইল কার্যক্রম জোরদার করায় বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু মালা ফাঁদই উদ্ধার হয়েছে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার ফুট। এতে হরিণের নিরাপদ বিচরণ বেড়েছে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব বাঘের চলাচলেও পড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. এম এ আজিজ বলেন, দীর্ঘ সময় বন মানুষের প্রবেশমুক্ত থাকায় এর ইতিবাচক প্রভাব এখন দৃশ্যমান। তিনি মনে করেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় সুন্দরবনকে ‘বিশ্রাম’ দেওয়ার এই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। করোনা মহামারির সময়ও বিশ্বজুড়ে মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ও বিচরণ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই সম্পর্কিত আরো খবর