বাগেরহাটের মোংলা বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ খুলে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে একদিকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে ক্ষুণ্ন হচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে মোংলা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় নানা নামে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজের সংখ্যা বাড়ছে। স্বল্প খরচে ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ খুলে একশ্রেণির ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেকেরই নেই প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা, নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় কাঠামো কিংবা স্বচ্ছ জবাবদিহিতা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব প্ল্যাটফর্মের কিছু ব্যক্তি সংবাদ সংগ্রহের নামে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, স্পা সেন্টার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভিডিও ধারণ বা ছবি তোলার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখান। পরে সংবাদ প্রকাশ না করার বিনিময়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দাবি করা অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একের পর এক সংবাদ বা পোস্ট প্রকাশ করা হয়। এসব পোস্ট বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সামাজিক ও ব্যবসায়িক চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের পর প্রকাশিত সংবাদ বা পোস্ট সরিয়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। এমন ঘটনা সত্য হলে তা সাংবাদিকতার নীতি ও পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ সংবাদ প্রকাশ বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের অভিযোগ, কথিত এসব সংবাদকর্মী নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করতে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত সংবাদ বা পোস্টের সংখ্যা উল্লেখ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। এতে অনেকেই আইনি বা সামাজিক হয়রানির আশঙ্কায় অভিযোগ প্রকাশ্যে আনতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন।
পেশাদার সাংবাদিকদের মতে, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত হন, তার দায় মূলধারার সাংবাদিকদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করা সংবাদকর্মীদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও পেশাগত মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সাধারণ মানুষের কাছেও প্রকৃত সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহারকারী ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর সঙ্গে দায়িত্বশীলতা, তথ্য যাচাই ও জবাবদিহিতাও অপরিহার্য। সংবাদ প্রকাশের অধিকার কোনোভাবেই কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অর্থ আদায়ের সুযোগ দিতে পারে না।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ ও মুছে ফেলার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে অনলাইন গণমাধ্যমের পরিচয়, নিবন্ধন, সম্পাদকীয় কাঠামো ও দায়িত্বশীলতার বিষয়গুলো আরও স্বচ্ছ করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষের মধ্যেও গণমাধ্যম, নিবন্ধিত সংবাদমাধ্যম ও ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এখন যে কেউ দ্রুত একটি ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ খুলে তথ্য প্রকাশ করতে পারেন। এতে তথ্যপ্রবাহ সহজ হলেও এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়েছে। সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ ভয়ভীতি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন, তা শুধু ব্যক্তির অপরাধ নয়—এটি পুরো সাংবাদিকতা পেশার প্রতি মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় সত্য, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জবাবদিহিতার চর্চাই হতে পারে এমন অপতৎপরতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এই বাংলা/এমএস