ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রামের চিলমারী নদীবন্দর। একসময় জৌলুস হারালেও এখনও রৌমারী, রাজীবপুর ও বিভিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এ বন্দর। প্রতিদিন হাজারো মানুষ নৌপথে যাতায়াত করলেও বন্দরে নেই ন্যূনতম যাত্রীসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা—গণশৌচাগার। ফলে দীর্ঘ সময় নৌপথ পাড়ি দিয়ে ঘাটে পৌঁছে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রীরা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলা এবং বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে নৌপথে চিলমারী বন্দরে পৌঁছাতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। দীর্ঘ এই যাত্রার পর ঘাটে এসে জরুরি প্রয়োজনে শৌচাগার না থাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাদের। অনেকে বাধ্য হয়ে আশপাশের বাসাবাড়িতে গিয়ে শৌচাগার ব্যবহারের অনুরোধ করেন। আবার লোকলজ্জায় কেউ কেউ নদীর তীরের খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কাজ সারতে বাধ্য হন।
এতে যাত্রীদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে। খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগের কারণে নদীর তীর ও আশপাশের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
নিয়মিত এ নৌপথ ব্যবহারকারী মো. শাহ্ মোমেন বলেন, “রৌমারী ও রাজীবপুর যেতে নৌকায় দীর্ঘ সময় লাগে। ঘাটে এসে শৌচাগারের প্রয়োজন হলে আশপাশের বাড়িতে যেতে হয়। এখানে একটি গণশৌচাগার থাকা খুবই জরুরি।”
নারী যাত্রী মোছা. শামসুন্নাহার বেগম বলেন, “পুরুষরা কোনোভাবে বাইরে কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু নারীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। ঘাটে শৌচাগার না থাকায় দীর্ঘক্ষণ কষ্ট সহ্য করতে হয়, নতুবা অপরিচিত মানুষের বাড়িতে যেতে হয়।”
কোটি টাকা রাজস্ব, নেই মৌলিক সুবিধা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে চিলমারী নদীবন্দর ঘাটটি এক কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় হলেও বন্দরে ন্যূনতম যাত্রীসেবা নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিলমারী বন্দর দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০টি নৌকা চলাচল করে। প্রতিটি নৌকায় গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী থাকেন। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এ ঘাট ব্যবহার করেন।
চিলমারী নদীবন্দরের রমনা ঘাট মাস্টার মো. সিদ্দিক বলেন, “ঘাট থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও যাত্রীসেবা একেবারেই শূন্য। নদীবন্দরে গণশৌচাগার স্থাপনের জন্য বিআইডব্লিউটিএকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা
চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জনসমাগমপূর্ণ নদীবন্দরে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগের কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত নিরাপদ শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
পাঁচ বছরেও উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ৩৪ শতাংশ
এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নদীবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প পাঁচ বছর ধরে চললেও এর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৪ শতাংশ বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকাজ চললেও ঘাটে যাত্রীসেবার মৌলিক সুবিধা বাড়েনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গণশৌচাগারের পাশাপাশি যাত্রীদের বসার ছাউনি ও সুপেয় পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিআইডব্লিউটিএর নদীবন্দরের পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র বলেন, “আপাতত আলাদা গণশৌচাগার নির্মাণের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ইতোমধ্যে বন্দরের প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে। জেটি নির্মাণকাজ শেষ হলে টার্মিনালটি যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তখন আর এ সমস্যা থাকবে না।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করে চিলমারী নদীবন্দরে নিরাপদ শৌচাগার, সুপেয় পানি, বসার স্থানসহ প্রয়োজনীয় যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা হবে। বিপুল রাজস্ব আদায়কারী এ গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরে ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই দাবি যাত্রী ও স্থানীয়দের।
এই বাংলা/এমএস