শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৯ পূর্বাহ্ন

চিকিৎসক-জনবল সংকটে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, দুর্ভোগে রোগীরা

এইবাংলা অনলাইন
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

উত্তরের দরিদ্রপ্রবণ জেলা কুড়িগ্রামের প্রায় ২০ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। তবে চিকিৎসক, নার্স, জনবল ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক সংকট এতটাই প্রকট যে প্রতিদিন শত শত রোগীকে দীর্ঘ অপেক্ষা ও সীমিত চিকিৎসাসেবা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও এখনো পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি পরে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০১৭ সালে এটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত হলেও সেই অনুপাতে জনবল বাড়েনি। বর্তমানে ৩৭১টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২০ জন। ৩৪০ জন নার্সের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৬০ জন, যা মূলত ১০০ শয্যার হাসপাতালের জনবল কাঠামোর সমপর্যায়ের।

বর্তমানে হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। চিকিৎসক সংকটের কারণে ওয়ার্ডে দিনে একবারের বেশি রোগী দেখা সম্ভব হয় না। দুপুরের পর ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করতে হয় পরদিন সকাল পর্যন্ত। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন দেখাতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক রোগীর মূল চিকিৎসা শুরু হতেও ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লেগে যায়।

অন্যদিকে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা যায়, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও কার্ডিওলজি বিভাগে কোনো সিনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। অ্যানেসথেসিয়া ও অর্থোপেডিক সার্জারিসহ আটটি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদ শূন্য রয়েছে। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২টি পদের মধ্যে ছয়টি খালি। এছাড়া মেডিকেল অফিসার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার, রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রারের একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের সেবাও পুরোপুরি বন্ধ।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

এদিকে হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবন নির্মিত হলেও সেখানে এখনো আইসিইউ ও নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। এতে পথে অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটও প্রকট। ইকোকার্ডিওগ্রাম, এন্ডোস্কপি ও ল্যাপারোস্কপি মেশিন কয়েক বছর ধরে অকেজো। অপারেশন যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার আধুনিক অটোক্লেভ না থাকায় পুরোনো একটি ছোট মেশিন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ছয়টি ইসিজি মেশিন প্রয়োজন হলেও রয়েছে মাত্র তিনটি। দুটি এক্স-রে ও দুটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছেন মাত্র একজন।

তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও দীর্ঘদিনের। আয়া, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীর বহু পদ শূন্য রয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১৫০ জন কর্মী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৭ জন।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ৩৭১ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ২০ জন কর্মরত আছেন। এই সীমিত জনবল দিয়েই গড়ে ৫০০ ভর্তি রোগী এবং বহির্বিভাগের বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। জনবল সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও বলেন, পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও রোগীর চাপের কারণে সেখানে সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। নতুন ভবনটি আইসিইউ পরিচালনার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল ছাড়া আইসিইউ চালু করলে রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের কুড়িগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও আধুনিক চিকিৎসাসুবিধার অভাবে জেলার মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল করা এবং আইসিইউ, এনআইসিইউসহ বিশেষায়িত সেবা চালুর জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

এই সম্পর্কিত আরো খবর