যে জমিতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে বছরের পর বছর ধানের ফসল নষ্ট হতো, সেই জমিতেই এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধাইজান খাল পুনঃখননের ফলে জলাবদ্ধতা দূর হওয়ায় বগুড়ার সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রায় ১ হাজার কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন দুলছে সোনালি ধানের শীষ।
একসময় সামান্য বৃষ্টিতেই এসব জমিতে পানি জমে ধান নষ্ট হতো। খাল পুনঃখননের পর জমির পানি সহজেই খালে নেমে যাচ্ছে। ফলে এবার রোপা-আমন আবাদে ভালো ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। খালের দুই তীরে তালসহ বিভিন্ন প্রজাতির ২ হাজার ২০০ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি খালের পাড়ে সবজি চাষও শুরু করেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের উত্তর ভেড়ভেড়ী মৌজার আরএস ৬৯, ১৫৭ ও ৪৩৬ দাগে অবস্থিত প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ ধাইজান খালটি ভরাট হয়ে গিয়েছিল। ফলে আশপাশের নিচু জমির পানি নিষ্কাশিত হতে পারত না। জলাবদ্ধতায় নষ্ট হতো ধানের ফসল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পের আওতায় খালটি পুনঃখনন করা হয়। এতে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে। উপকৃত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার কৃষক।
প্রকল্পের জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ৯৯৬ টাকা। অব্যয়িত অর্থের একটি অংশ ১০ লাখ ১৬ হাজার ৩০৫ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তর ভেড়ভেড়ী গ্রামের বিস্তীর্ণ নিচু জমিতে বর্ষায় ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত পানি জমে থাকত। এতে ধান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় আবাদও করা যেত না। গত বছরগুলোতে এসব জমিতে বিঘাপ্রতি ১০ মণ ধান পাওয়াও কঠিন ছিল। এবার খাল পুনঃখননের ফলে পানি নিষ্কাশিত হওয়ায় বিঘাপ্রতি ১৭ থেকে ১৮ মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা।
এ ছাড়া খালটি পুনঃখননের ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি এবং জলজ উদ্ভিদ ও মাছের বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
উত্তর ভেড়ভেড়ী গ্রামের কৃষক রহিমুদ্দিন বলেন, “এই জমিগুলোতে আগে জলাবদ্ধতা ছিল। বর্ষা মৌসুমে ফসল নষ্ট হতো, আবাদ করা যেত না। এ বছর আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৬ মণ বেশি ধান পাওয়ার আশা করছি। খাল পুনঃখননের ফলে বোরো আবাদেও সুবিধা হবে।”
একই গ্রামের কৃষক নুর ইসলাম ও সুন্দরী জানান, বর্ষার সময় ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত ধানের জমিতে পানি জমে থাকত। এতে ফসল নষ্ট হয়ে যেত। এবার খাল পুনঃখননের ফলে জমির পানি খালে নেমে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা হয়নি। তাঁরা বলেন, “এ বছর বিঘাপ্রতি ১৭ থেকে ১৮ মণ ধান পাওয়ার আশা করছি। কোনো সমস্যা ছাড়াই ফসল চাষ করতে পেরেছি। খালটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।”
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে খালটির অবশিষ্ট অংশ পুনঃখনন করা হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে। এতে ভবিষ্যতে ফসল চাষে তাঁদের দুর্ভোগ কমবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ১ হাজার কৃষক এ প্রকল্পের সুফল পেয়েছেন। এ বছর আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা লতিফুর রহমান জানান, খাল পুনঃখনন শেষে অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। খালটি পুনঃখননের ফলে কৃষকদের জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে এবং তাঁদের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় ধাইজান খাল পুনঃখননের ফলে প্রায় ১ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন। আমনের বাম্পার ফলনের পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধিরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই বাংলা/এমএস