রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন

বাবা না হয়েও বাবার দায়িত্বে ২৪ বছরে ১১২ এতিম মেয়ের বিয়ে দিলেন নাটোরের রুবেল

নাটোর প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

বাবা নেই প্রায় এক দশক। অভাবের সংসারে অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছেন মা। জীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়সে এসে তার বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। সামর্থ্য না থাকায় বড় আয়োজনের কথা ভাবতেই পারেননি।

ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ালেন একজন মানবিক মানুষ। শুধু বিয়ের খরচ বহন নয়, নিজের মেয়ের মতো করে ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করলেন নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল। গত ২৪ বছরে এভাবে তিনি ১১২ জন অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এবার তার উদ্যোগে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

শুক্রবার বালাদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে সাজানো বিয়ের গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য চেয়ার-টেবিল সাজানো। বাড়ির এক পাশে চলছে রান্নার ব্যস্ততা। গরু, খাসি, মুরগি, ডিম ও পোলাওসহ নানা পদের খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে।

চারপাশের আয়োজন দেখে বোঝার উপায় ছিল না—এটি একজন বাবা হারানো অসহায় মেয়ের বিয়ে।

বাড়ির একটি জরাজীর্ণ কক্ষে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদল নারী ব্যস্ত তাকে সাজাতে। বাইরে উৎসবের ব্যস্ততা, ভেতরে কনের সাজ—সব মিলিয়ে মুখর পুরো বাড়ি।

প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান সুমাইয়া আক্তার তিথি। এরপর মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন এবং সংসার চালিয়েছেন।

কিন্তু মেয়ের বিয়ের বয়স এলে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন জহুরা খাতুন। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বড় আয়োজনের সামর্থ্য ছিল না তার।

এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম দেখতে পান তিনি। পরে রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিথির পরিবারের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পর বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান রুবেল।

এরপর দিন-তারিখ ঠিক হয়। বৃহস্পতিবার রাতে শুরু হয় গায়ে হলুদের আয়োজন। শুক্রবার দিনভর চলে বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা।

জুমার নামাজের পর কনে বাড়িতে আসেন বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা। সোনার আংটি দিয়ে বরকে বরণ করেন রুহুল আমিন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

একটি সাধারণ ঘর সেদিন যেন পরিণত হয় আনন্দের ঠিকানায়। যে বাড়িতে এতদিন অভাবের ছাপ ছিল, সেই বাড়িতেই বেজে ওঠে বিয়ের সানাই। মায়ের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও আনন্দ।

তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি সব দায়িত্ব নেন। নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের আয়োজন করেছেন। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।

নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি ও বর তরিকুল ইসলাম রুবেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিথি জানান, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিন বাবার অভাব তেমনভাবে অনুভব করতে পারেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।

স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও এলাকাবাসীও রুবেলের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বছরের পর বছর বিয়ের দায়িত্ব পালন করা একটি মহৎ ও মানবিক কাজ। সমাজের বিত্তবানরা এমন কাজে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।

রুহুল আমিন রুবেল বলেন, কোনো প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, পরকালের জন্যই তিনি গত ২৪ বছর ধরে অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দিয়ে আসছেন। এটি তার ১১২তম মেয়ের বিয়ে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজখবর নেন। সত্যিই অসহায় হলে নিজের তহবিল থেকে বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন।

পেশায় ব্যবসায়ী রুবেলের ভাষ্য, মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও সৌভাগ্য মনে করেন।

একজন বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যে দায়িত্ব পালন করেন, তিথির বেলায় সেই দায়িত্বই যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রুবেল। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও মেয়ের বিয়েতে বাবার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

তিথির জীবনে বাবার শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে বিয়ের এই দিনে একজন মানুষ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও ভালোবাসা, দায়িত্ব ও মানবিকতার মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি হয়।

১১২টি বিয়ে তাই শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়; এটি ১১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর