মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামের নাম উচ্চারিত হলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে এক ব্যতিক্রমী দেবীমূর্তি—লাল দুর্গা। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার পরিচিত রূপের বাইরে সম্পূর্ণ রক্তবর্ণের এই প্রতিমাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য, লোককথা ও পারিবারিক ইতিহাস। শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় দেবীর অনন্য রূপ দেখতে এবং প্রার্থনা জানাতে এখানে সমবেত হন অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী।
স্থানীয়ভাবে পাঁচগাঁও দুর্গাবাড়ি বা লাল দুর্গা মন্দির নামে পরিচিত এই উপাসনালয় শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়, বরং এলাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, পাঁচগাঁওয়ে লাল দুর্গার পূজা শুরু হয়েছিল প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি আগে। সেই থেকে দাস পরিবারের উদ্যোগে বংশপরম্পরায় চলে আসছে এই বিশেষ পূজার আয়োজন। সময়ের সঙ্গে পারিবারিক পরিসর ছাড়িয়ে এটি বৃহত্তর জনসমাগমের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধক সর্বানন্দ দাসের নাম। স্থানীয় লোককথা অনুসারে, তিনি একসময় আসামের শিবসাগরে মুন্সি পদে কর্মরত ছিলেন। ধর্মসাধনার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে একপর্যায়ে তিনি কামরূপ-কামাখ্যা ধামে যান। সেখানে শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমীতে পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে দেবীজ্ঞানে কুমারী পূজা করেন বলে প্রচলিত রয়েছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, পূজা শেষে শিশুটিকে প্রণাম করতে গিয়ে তিনি তার গায়ের রং পরিবর্তিত হয়ে টকটকে লাল হয়ে যেতে দেখেন। ঘটনাটিকে দেবীর অলৌকিক প্রকাশ হিসেবে বিশ্বাস করেন সর্বানন্দ দাস। এরপর নিজের জন্মভূমি পাঁচগাঁওয়ে দেবীর এই বিশেষ রূপে পূজা করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রচলিত কাহিনি বলে, দেবী তাঁর প্রার্থনায় সাড়া দেন এবং পাঁচগাঁওয়ে রক্তবর্ণ প্রতিমায় পূজা প্রচলনের নির্দেশ দেন। সেই বিশ্বাস থেকেই লাল দুর্গার আরাধনা শুরু হয়, যা আজও তাঁর বংশধরেরা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন।
লাল দুর্গার প্রচলিত ইতিহাসে আরও একটি কাহিনি বিশেষভাবে আলোচিত। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, দেবী তাঁর আগমনের স্মারক হিসেবে সর্বানন্দ দাসের বাড়ির একটি কাঁচা ঘরের বেড়ায় পাঁচটি লাল আঙুলের ছাপ রেখে গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে কিছু অলংকার রেখে যাওয়ার কথাও প্রচলিত রয়েছে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, ওই অলংকারগুলো বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত হয়ে আসছে এবং পূজার সময় প্রতিমাকে সাজাতে ব্যবহার করা হয়। তবে এসব কাহিনি ও অলংকারের ইতিহাসের স্বাধীন ঐতিহাসিক যাচাই প্রয়োজন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই বিশ্বাসই লাল দুর্গাকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ ও ঐতিহ্যকে আরও গভীর করেছে।
দুর্গাপ্রতিমার প্রচলিত রূপের সঙ্গে পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গার সবচেয়ে বড় পার্থক্য এর সম্পূর্ণ লাল বা রক্তবর্ণ অবয়ব। এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যই মন্দিরটিকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, প্রথম দিকে লাল প্রতিমা নির্মাণ নিয়ে পুরোহিত ও গ্রামবাসীর মধ্যে আপত্তি দেখা দিয়েছিল। পরে দেবীর প্রতি বিশ্বাস ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এই রীতিই স্থায়ী হয়ে ওঠে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
দীর্ঘকাল ধরে দাস পরিবারের উদ্যোগে আয়োজিত এই পূজার বর্তমান পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন সাধক সর্বানন্দ দাসের বংশধর সঞ্জয় দাস। তাঁদের পারিবারিক উদ্যোগে টিকে থাকা এই ঐতিহ্য আজ বৃহত্তর এলাকার মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মাটির প্রতিমা নির্মাণ সম্ভব না হওয়ায় সে বছর প্রতিমাপূজার পরিবর্তে ঘটপূজার মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আবারও প্রতিমা নির্মাণ ও পূজার প্রচলিত ধারায় ফিরে আসে আয়োজনটি।
স্থানীয় ঐতিহ্যে এই ঘটনাকে প্রতিকূলতার মধ্যেও ধর্মীয় আচার ও পারিবারিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার স্মারক হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘ সময়ের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও পূজার ধারাবাহিকতা রক্ষা পাঁচগাঁওয়ের মানুষের ধর্মীয় অনুরাগ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতিফলন।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমীতে পাঁচগাঁও দুর্গাবাড়ি পরিণত হয় ভক্ত-দর্শনার্থীদের মিলনস্থলে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে আসেন। কেউ দেবী দর্শন করেন, কেউ মানত পূরণের আশায় প্রার্থনা জানান, আবার কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসেন।
পূজাকে কেন্দ্র করে মন্দির ও আশপাশের এলাকায় বসে গ্রামীণ মেলা। মাটির খেলনা, ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, ধর্মীয় সামগ্রী, কুটিরশিল্প এবং বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্যের দোকানে জমে ওঠে মেলার পরিবেশ। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এই আয়োজন গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীর চাপ বাড়ায় রাজনগর-বালাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কসহ আশপাশের এলাকায় যানবাহন চলাচলে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই দর্শনার্থীদের যাতায়াতের পরিকল্পনা আগে থেকে করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন।
পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে রয়েছে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস। অনেকে মনস্কামনা পূরণের আশায় প্রার্থনা করেন, আবার কেউ প্রদীপ, বস্ত্র ও অন্যান্য পূজাসামগ্রী নিবেদন করেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী, হোমযজ্ঞ ও পশুবলির আয়োজনও হয়ে থাকে।
এসব আচার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ভক্তদের বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। পূজাকে ঘিরে দর্শনার্থীর সংখ্যা, বলির পরিমাণ কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
পাঁচগাঁও ও আশপাশের অঞ্চল ইতিহাসের নানা স্মৃতিতে সমৃদ্ধ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী লীলা নাগের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্কের কথাও স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও অঞ্চলটির ইতিহাসের অংশ।
মৌলভীবাজার জেলা সদর কিংবা রাজনগর উপজেলা সদর থেকে সড়কপথে পাঁচগাঁওয়ে যাওয়া যায়। প্রচলিত স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, রাজনগর উপজেলা সদর থেকে গ্রামের দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। দুর্গোৎসবের মূল দিনগুলোতে ভিড় বেশি হতে পারে, তাই হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে যাত্রা করা ভালো।
পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গা কেবল একটি ব্যতিক্রমী প্রতিমা নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে কয়েক শতাব্দীর পারিবারিক উত্তরাধিকার, ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং গ্রামীণ জনজীবনের নানা অনুষঙ্গ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আয়োজন স্থানীয় মানুষের কাছে যেমন ভক্তি ও আবেগের বিষয়, তেমনি বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গার পূজা ধরে রেখেছে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য। রক্তবর্ণ প্রতিমার অনন্য রূপ, সাধক সর্বানন্দ দাসকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনি এবং উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাগম—সব মিলিয়ে পাঁচগাঁও আজও শারদীয় দুর্গোৎসবের এক বিশেষ আকর্ষণ।
এই বাংলা/এমএস