কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
তিস্তার ভয়াল ভাঙন থেকে মানুষকে রক্ষার আশায় শুরু হয়েছিল প্রায় ৩৬ কোটি টাকার ভাঙনরোধ প্রকল্প। কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পের অন্তত একশ মিটার নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এতে আবারও নতুন করে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার কালপানি বজরা ও পশ্চিম কালপানি বজরা গ্রামের হাজারো পরিবারের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো কাজ শুরু না করা, নিম্নমানের তদারকি এবং সাব-ঠিকাদারের গাফিলতির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নিজেদের দায় অস্বীকার করে বলছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী সাব-ঠিকাদারের কারণে তারা বিপাকে পড়েছেন।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্পের (দক্ষিণ ইউনিট) আওতায় থেতরাই ও বজরা ইউনিয়নে তিস্তার বাঁ তীর রক্ষায় পূর্ব সতর্কতামূলক ভাঙনরোধ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের প্রথম ধাপে তিন কিলোমিটার এলাকায় ১৩টি প্যাকেজে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আড়াই কিলোমিটার এলাকায় ছয়টি প্যাকেজে বরাদ্দ ছিল আরও ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
প্রকল্প অনুযায়ী নদীর তীরে সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণে জিওব্যাগ দিয়ে স্লোপ কাটিং, টপ ও গাইডওয়াল নির্মাণ এবং নিচের অংশে বালুভর্তি জিওব্যাগ ডাম্পিং করার কথা ছিল। ২০২৫ সালের মার্চে কাজ শুরু হয়ে ওই বছরের ১৮ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল। পানি বাড়ায় সময়মতো কাজ শেষ হয়নি। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। এর মধ্যে ১৯টি প্যাকেজের মধ্যে ১৬টির কাজ শেষ হলেও তিনটি প্যাকেজের কাজ মেয়াদের শেষ দিকে শুরু করেন সাব-ঠিকাদাররা। ততদিনে প্রকল্পের একটি অংশ নদীতে ধসে পড়ে। বর্তমানে কাজের মেয়াদ আবারও বাড়িয়ে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
গত ১৮ মে কালাপানি বজরা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অন্তত একশ মিটার এরই মধ্যে নদীতে তলিয়ে গেছে। নিচের অংশের গাইডওয়াল নির্মাণ এখনও শুরুই হয়নি। ৭৫ বছর বয়সী মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘আগে মানুষের বাড়িতে থাকতাম। পরে নদীর কূলত ছোট্ট একটা ঘর করছি। এখন ঝড়-বৃষ্টি আর নদীর ভাঙনে চোখে ঘুম নাই। শেষ বয়সের ঠিকানাও বুঝি নদীত যাইবো।’ একই গ্রামের মাজেদা বেওয়া বলেন, ‘নদী বাঁধা দেখেই বাড়ি সরাই নাই। এখন যে অবস্থা, তাতে বুঝি বাড়ি ভাঙা ছাড়া উপায় নাই। বাড়ি ভাঙলে কোথায় যামো?’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মোঃ এনামুল হক বলেন, ‘কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি। কিন্তু ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেউ গুরুত্ব দেয়নি। এখন নদীর যে অবস্থা, তাতে গ্রাম দুটি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
উলিপুর উপজেলার পাউবোর কার্যসহকারী মোঃ মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘সাব-ঠিকাদার সময়মতো কাজ শুরু না করায় এই পরিস্থিতি। এখনও গাইডওয়াল হয়নি। পানির নিচে কীভাবে কাজ হবে, সেটিই চিন্তার বিষয়।’
সাইট ম্যানেজার মোঃ আসাদুজ্জামান পলাশ বলেন, ‘আগে নিচের গাইডওয়াল করতে পারলে সমস্যা হতো না। কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে।’
তবে সাব-ঠিকাদার ও বিএনপি নেতা মোঃ শফিকুল ইসলাম শফির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাইটের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি অবগত নই।
এ বিষয়ে সাব-ডিভিশনাল প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল কাদের বলেন, ‘ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যে কোনোভাবে ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। কাজ শেষ না হলে বিল দেওয়া হবে না।’
এই বাংলা/এমএস
টপিক

