বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্লু-ইকোনমি থেকে সী-উইড: মৎস্য খাতের ২০৩০ লক্ষ্য সামনে রেখে বড় কর্মপরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য খাতকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। এ খাতের উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়ার পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সময়ের মধ্যে দেশের বার্ষিক মৎস্য উৎপাদন ৬৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্যচাষ সম্প্রসারণ, ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং মৎস্য খাতের জন্য প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের উপস্থাপিত প্রেজেন্টেশনে দেশের মৎস্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম, সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি, আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা এবং খাতটির প্রধান চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলায় করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।

প্রেজেন্টেশনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মৎস্য উৎপাদন প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫২.২৩ লাখ মেট্রিক টন। জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২.৭২ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ২২.৯৬ শতাংশ। পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান মিলিয়ে দেশের প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষের জীবিকা মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ নারী সরাসরি মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। দেশের মোট রপ্তানিতেও মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

টেকসই উৎপাদন ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্ব

মৎস্য অধিদপ্তরের ভিশন হলো মৎস্য ও মৎস্যজাত উৎস থেকে প্রাণিজ পুষ্টির চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং রপ্তানি আয় বাড়ানো। আর মিশনের ক্ষেত্রে টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মৎস্যজীবী ও মৎস্যচাষিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে অধিদপ্তরের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক জলাশয়ে পোনা মাছ অবমুক্ত করা, উপজেলা পর্যায়ে মৎস্যচাষের প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন, মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন, বিল নার্সারি গড়ে তোলা এবং সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা।

এ ছাড়া জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান, নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই মৎস্য আহরণ নিশ্চিত করতে আইন বাস্তবায়ন এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনাও চলমান রয়েছে।

এর পাশাপাশি সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ জরিপ ও ব্যবস্থাপনা, ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন, উপকূলীয় মৎস্যচাষ সম্প্রসারণ, সী-উইড চাষ, চিংড়ি উন্নয়ন এবং ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তর ১০টি বিনিয়োগ প্রকল্প ও ৭টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

জলমহাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ

সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রেজেন্টেশনে জানানো হয়, ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে জলমহাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া নিষিদ্ধ মৌসুমে ইলিশ জেলেদের খাদ্য সহায়তা, সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলেদের জন্য ভিজিএফ সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

মৎস্যচাষে আসছে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন

মৎস্য খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার আওতায় আইওটি (IoT) সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রিসিশন অ্যাকুয়াকালচার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে মাছের রোগ শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য ফিশ ডিজিজ সার্ভেইলেন্স, রোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, খামারভিত্তিক ডাটাবেইস তৈরি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন ঝুঁকিতে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের সুরক্ষা দিতে মৎস্য বীমা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বীমা ব্যবস্থা চালু করে পরবর্তীতে তা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গভীর সমুদ্রে টুনা আহরণে নতুন উদ্যোগ

ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ জন্য লং-লাইনার টুনা ভেসেল ব্যবহার, গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে মাছ আহরণের জন্য লাইসেন্স প্রদান, সামুদ্রিক নজরদারি জোরদার এবং মেরিন ফিশারিজ সার্ভেইলেন্স কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সী-উইড ঘিরে নতুন সম্ভাবনা

সী-উইড বা শৈবালভিত্তিক শিল্পকে সম্ভাবনাময় নতুন খাত হিসেবে দেখছে মৎস্য অধিদপ্তর। এ খাতের বিকাশে সী-উইড চাষের প্রদর্শনী, ড্রাইং র্যাক বিতরণ, আগার উৎপাদন ইউনিট স্থাপন এবং চাষিদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

পাশাপাশি সী-উইড থেকে ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য তৈরি এবং এসব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

পাঁচ বছরে উৎপাদন ৬৫ লাখ টন করার পরিকল্পনা

মৎস্য অধিদপ্তরের পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মৎস্য উৎপাদন ৬৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্য রপ্তানি থেকে আয় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ কর্মপরিকল্পনার আওতায় দেশের সব মৎস্যচাষী ও মৎস্যজীবীর নিবন্ধন সম্পন্ন করা, ৫ হাজার GAP সার্টিফায়েড খামার প্রতিষ্ঠা, কোয়ারেন্টাইন ও পরীক্ষাগার অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং ১ লাখ প্রশিক্ষিত কর্মী ও উদ্যোক্তা তৈরি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় আরও রয়েছে ৫ হাজার IoT-ভিত্তিক অটোমেটেড খামার স্থাপন, জাতীয় মৎস্য সম্পদ জরিপ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা, ১ লাখ খামারিকে বীমার আওতায় আনা এবং ভ্যালু অ্যাডেড মৎস্যপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো।

রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৫টি বিভাগীয় মাননিয়ন্ত্রণ ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাব স্থাপন, ১৬টি জাতীয় মৎস্যচাষ ও ব্যবস্থাপনা অঞ্চল ঘোষণা এবং ২ হাজারের বেশি অবক্ষয়িত জলাশয় পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

চিংড়ি ও সী-উইড রপ্তানিতে জোর

চিংড়ি খাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৫ হাজার আধুনিক চিংড়ি খামার গড়ে তোলা, বিদেশি বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

একই সঙ্গে সী-উইড শিল্প প্রতিষ্ঠা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণ এবং এ খাতের রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

জনবল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

তবে এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনবল সংকটকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।

উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, মৎস্য অধিদপ্তরে অনুমোদিত ৬ হাজার ২০১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৮২৯ জন। অর্থাৎ ২ হাজার ৩৭২টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। এর পাশাপাশি আরও ১ হাজার ৯১১টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

প্রেজেন্টেশনে মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ হিসেবে মৎস্যচাষের যান্ত্রিকীকরণ, ভ্যালু চেইনের উন্নয়ন, মাছ আহরণের পরবর্তী পর্যায়ে অপচয় কমানো, মৎস্যখাদ্য উৎপাদনে আমদানি নির্ভরতা কমানো, মেরিকালচার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

এর পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো, সামুদ্রিক সম্পদের জরিপ পরিচালনা, অবক্ষয়িত জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অঞ্চলভিত্তিক বিশেষায়িত প্রকল্প গ্রহণ, শূন্য পদে নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণা ও পরীক্ষাগার স্থাপন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মৎস্যচাষিদের সহায়তা বাড়ানো এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত কর্মসূচিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে মৎস্য রপ্তানি আয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর