ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি :
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বুড়ি তিস্তা নদী পুনঃখনন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আনসার ক্যাম্পে সংঘটিত সংঘবদ্ধ হামলাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই ক্যাম্পে ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার বা হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
দুই দিন ধরে চলা সহিংসতার পর বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেল ৫টার দিকে জলঢাকা ও ডিমলা থানার পুলিশ বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্যের সহায়তায় আনসার ক্যাম্পটি পুনরুদ্ধার করে। তবে সেখানে পাওয়া যায় ধ্বংসস্তূপের চিত্র। এ ঘটনায় জলঢাকা থানায় ২ জানুয়ারি পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় নামীয় ৪১ জনসহ অজ্ঞাত আরও প্রায় ৬৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এখনো আনসার বাহিনীর ব্যবহৃত ১০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি, রেশন, পোশাক ও অন্যান্য সরকারি মালামাল উদ্ধার করা যায়নি। কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল থেকে। বুড়ি তিস্তা নদীসংলগ্ন আনসার ক্যাম্প ও নদী খনন প্রকল্প এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার দিকে আলীম, জাহেদুল ও এমদাদুল হক নামের তিন ব্যক্তি মাইকিং করে লোকজন জড়ো করলে কয়েক শতাধিক মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে ক্যাম্পে হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এটি আকস্মিক নয়—বরং সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত আক্রমণ।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে হামলাকারীরা আবার ক্যাম্পে ঢুকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের মারধর করে বের করে দেয় এবং পুরো ক্যাম্প দখলে নেয়। টিনশেড ও পাকা স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়, জানালা-দরজা, জেনারেটর, অফিস সরঞ্জামসহ সব সরকারি মালামাল লুট করা হয়। ক্যাম্পটি কার্যত চিহ্নহীন হয়ে পড়ে।
এ সময় জাতীয় নদী খনন প্রকল্পে ব্যবহৃত সাতটি এক্সকাভেটর ভাঙচুর করে অচল করে দেওয়া হয়। প্রাথমিক হিসাবে সরকারি ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।
ঘটনার ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে একাধিক সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয়। আনসার সদস্য, সাংবাদিক, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
আহত আনসার সদস্য মো. এনামুল হক জানান, তাদের থাকার কক্ষ, অফিস ও আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে। রেশন, পোশাক, নগদ অর্থসহ ব্যক্তিগত মালামাল লুট করা হয়েছে। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ব্যবহৃত গুলি ছিনতাই মানে দেশের নিরাপত্তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা।”
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান জানান, দুই দিনে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি জমি উদ্ধার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চললেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।
জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. মাজহারুল ইসলাম ভূঁইয়া, পিভিএম বলেন, ১০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি, রেশন ও পোশাক লুট হয়েছে এবং সেগুলো এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম পিপিএম জানান, নাশকতার ঘটনায় জলঢাকা থানায় দুটি মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
পুনরুদ্ধার হওয়া আনসার ক্যাম্পটি এখন ধ্বংসের নিদর্শন হয়ে আছে। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি ক্যাম্পে হামলা নয়—রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতেই কীভাবে এমন তাণ্ডব ঘটল, লুট হওয়া গুলি কোথায় গেল এবং কারা এই হামলার নেপথ্যে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

