সন্ধ্যা নামলেই একসময় জনশূন্য হয়ে পড়ত নওগাঁর সারাইগাছী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের দীর্ঘ একটি অংশ। দিনের ব্যস্ত সড়কটিই রাতের আঁধারে পরিণত হতো আতঙ্কের জনপথে। কখনো গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ, কখনো রামদা বা লোহার রড হাতে পথরোধ—ডাকাতদের এমন তৎপরতায় চালক-যাত্রীদের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের ব্যবসায়ীরাও ছিলেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপ চালকেরা বাধ্য হয়ে দলবদ্ধভাবে চলাচল করতেন। সড়কের পাশের বাজারগুলোর ব্যবসায়ীদের অনেকেই সন্ধ্যার আগেই দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিতেন। দিনের বিক্রির টাকা দোকানে রেখে যাওয়াও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। নওগাঁ জেলা পুলিশের পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় সড়কটির রাতের দৃশ্যপটে এসেছে পরিবর্তন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট, সারাইগাছী মোড়ে পুলিশ বক্স, সোলার লাইট স্থাপন, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, নিয়মিত টহল এবং রাত ৯টার পর বিশেষ ‘এসকর্ট’ ব্যবস্থায় যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। পাশাপাশি অতীতে সংঘটিত ডাকাতির মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নওগাঁয় এই সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৬টি ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছিল। তবে গত সাত মাসে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সড়কটির অতীতের ভয়াবহতার অন্যতম উদাহরণ পোরশা উপজেলার বেজোড়া বাজার। গত বছরের ডিসেম্বরে এক রাতে বাজারটির প্রায় ২০টি দোকানে ডাকাতি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু বাজার নয়, সড়কেও ছিল একই আতঙ্ক। গাছ ফেলে যানবাহন থামিয়ে চালক ও যাত্রীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা-পয়সা ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ছিল। ফলে সন্ধ্যার পর এই সড়কে চলাচল অনেকের কাছেই বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতো।
সম্প্রতি মধ্যরাতে সারাইগাছী মোড় থেকে বন্ধুপাড়া মোড় পর্যন্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রয়েছে চেকপোস্ট। সারাইগাছী মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ বক্স। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে সোলার লাইট। ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা।
চেকপোস্টে সন্দেহজনক যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। রাত ৯টার পর ঝুঁকিপূর্ণ অংশে যানবাহনগুলোকে একত্র করে পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে পার করে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কে পুলিশের বিশেষ টিমের নিয়মিত টহলও রয়েছে।
ফলে অপরাধীদের ওপর নজরদারি যেমন বেড়েছে, তেমনি চালক ও যাত্রীদের মধ্যেও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
ডাকাতির আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল সড়কের পাশের ব্যবসায়ীদের জীবনে। বেজোড়া বাজারের ইলেকট্রিক ব্যবসায়ী ইসমাইল ইসলাম বলেন, ‘এই রোডে আগে আমাদের ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। সড়কে গাছ ফেলে ডাকাতি করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর ডাকাতরা অনেক ব্যবসায়ীকে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাজারের দোকানেও ডাকাতি হয়েছে।’
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখন আর আমাদের ভয় নেই। বাজারে নিয়মিত রাতে পুলিশ ডিউটি করছে। আগে যেখানে সন্ধ্যা সাতটা-আটটার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে দিতে হতো, এখন রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রেখে ব্যবসা করতে পারছি।’
বাজারের সেলুন ব্যবসায়ী সুবির দাস বলেন, ‘আগে প্রায়ই ডাকাতির ভয় থাকত। দোকানে কোনো টাকা রেখে যাওয়া যেত না। রাতেও স্বস্তিতে ঘুমাতে পারতাম না। এখন সেই ভয় নেই। নির্বিঘ্নে বাড়ি গিয়ে ঘুমাতে পারি।
সড়কের দায়িত্বে থাকা পোরশা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অমিত কুমার দাস বলেন, ‘পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সড়কের দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রায় ছয়টি চেকপোস্টের মাধ্যমে গাড়িগুলো পার করা হয়। সন্দেহজনক যানবাহনে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, নির্দিষ্ট সময়ে যানবাহনগুলোকে একত্র করে পুলিশের নিরাপত্তায় ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পার করে দেওয়া হয়।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পত্নীতলা থেকে পোরশা হয়ে আড্ডা পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিত ছিল। এ পথে নিয়মিত ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটত।
তিনি বলেন, ‘নওগাঁ জেলায় গত বছর ১৬টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। আমি এই জেলায় যোগদানের পর আমরা এসব ঘটনার পূর্বাপর ইতিহাস পর্যালোচনা করি এবং কয়েকটি ধাপে কাজ শুরু করি।’
পুলিশ সুপার জানান, প্রথমে পোরশা থানায় জনবল বাড়ানো হয়। পাশাপাশি লজিস্টিকস ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানো হয়। অতীতে সংঘটিত ডাকাতির মামলাগুলো পর্যালোচনা করে আসামিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ টিম গঠন করা হয়। ওই টিমের মাধ্যমে একাধিক ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুধু দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতির মধ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থা সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গোপনে অবস্থান নেওয়া এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমেও অপরাধীদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমরা ওই সড়কে এখনো মাঝে মাঝে ওত পেতে থাকি এবং স্পেশাল ড্রাইভ দিই, যাতে আমরা ডাকাতি প্রতিরোধ করতে পারি।’
পুলিশের একাধিক পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয়টি ধাপে কাজ শুরু করার পর ফেব্রুয়ারি থেকে এ সড়কে আর কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। তবে ডাকাতি বন্ধ হওয়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা কমানো হয়নি; বরং সড়কটিতে পুলিশের অবস্থান আরও শক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় পুলিশের উদ্যোগে কয়েকটি সোলার লাইটও স্থাপন করা হয়েছে। এতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো আলোকিত হয়েছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘যারা এই সড়কে অপরাধ করত বা অপরাধ করার ইচ্ছা আছে, তাদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেবে। পোরশা, সাপাহার, সারাইগাছী ও আড্ডা—এই সড়কে ডাকাতির অধ্যায় আমরা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে চাই।’
একসময় সন্ধ্যার পর যে সড়কে চলাচল মানেই ছিল উৎকণ্ঠা, সেই সড়কে এখন রাত দুই-তিনটাতেও রোগী নিয়ে ছুটছে সিএনজি, পণ্য নিয়ে চলছে পিকআপ ও ট্রাক। বেজোড়া বাজারের ব্যবসায়ীরাও আগের মতো সন্ধ্যা হলেই দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিচ্ছেন না। বরং রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছেন।
চেকপোস্ট, এসকর্ট, নিয়মিত টহল, বিশেষ অভিযান এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সড়কটির নিরাপত্তায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার বড় প্রমাণ হলো গত সাত মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার কোনো ঘটনা না ঘটার তথ্য।
আতঙ্কের সেই সড়ক এখন শুধু যাতায়াতের পথ নয়—রাতের নিরাপদ চলাচলের ওপর মানুষের আস্থাও ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনছে।
এই বাংলা/এমএস