কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার থেতরাই উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে দুপুরের বিরতির ঘণ্টা পড়তেই শিক্ষার্থীরা দ্রুত খাবার খেয়ে নেয়। এরপর কেউ কেউ ব্যাগ থেকে বের করে সুঁই-সুতা ও সুতা দিয়ে তৈরি করার উপকরণ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা বসে পড়ে টুপি বোনার কাজে। বিরতি শেষের ঘণ্টা বাজতেই আবার সবকিছু গুছিয়ে ব্যাগে রেখে ক্লাসে ফিরে যায় তারা।
এটি কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার থেতরাই উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের চিত্র। পড়াশোনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি অবসর সময় কাজে লাগিয়ে টুপি বোনার মাধ্যমে নিজেদের পড়ালেখার খরচ জোগাচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে পরিবারেও আর্থিক সহায়তা করছে তারা।
শুধু এই বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এই উদ্যোগ। উলিপুর উপজেলার থেতরাই ও দলদলিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৮০টি গ্রামের অন্তত দেড় হাজার শিক্ষার্থী এবং প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার অসহায় ও দরিদ্র নারী টুপি বোনার কাজের সঙ্গে যুক্ত। আর এই উদ্যোগের মূল প্রেরণা থেতরাই ইউনিয়নের পাতিলাপুর গ্রামের মোছাঃ মোর্শেদা বেগম। তাঁর হাত ধরেই গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে এই টুপি বোনার কাজ। এসব টুপি সৌদি আরব, দুবাই, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
এলাকায় এই টুপির সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় পাতিলাপুর গ্রামকে অনেকে ‘মোর্শেদার টুপির গ্রাম’ বলেও ডাকেন। টুপি বোনার মাধ্যমে নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ায় গ্রামগুলোতে বাল্যবিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদের হার কমেছে। পাশাপাশি কমেছে বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতাও। বদলে গেছে ৮০টি গ্রামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র।
পাতিলাপুর গ্রামের বাসিন্দা মোছাঃ মোর্শেদা বেগম আট ভাইবোনের মধ্যে ষষ্ঠ। মেধাবী হলেও আর্থিক সংকটের কারণে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাঁর বিয়ে হয়ে যায় একই গ্রামের জাবেদ আলীর সঙ্গে। তবে ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
১৯৯৫ সালে স্বামীর চাকরির সুবাদে টাঙ্গাইলে বসবাস শুরু করেন মোর্শেদা। সেখানে প্রতিবেশী মোছাঃ কমলা বেগমের কাছ থেকে টুপি বোনার কাজ শেখেন। প্রথম দিকে একটি টুপি তৈরি করে ২৫০ টাকা মজুরি পান। তাঁর দক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে কোম্পানির সুপারভাইজার খোকন মিয়া তাকে আরও বেশি অর্ডার নিতে উৎসাহ দেন।
কয়েক বছর টুপি বুনে ভালো আয় করার পর তিনি ভাবেন, গ্রামের অসহায় নারীদেরও এই কাজ শেখালে তাদের অভাব কিছুটা লাঘব হবে। সেই ভাবনা থেকেই ২০০০ সালে গ্রামে ফিরে আসেন এবং অর্ডার এনে নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। শুরুতে কেউ আগ্রহ দেখায়নি। পরে ধীরে ধীরে গ্রামের নারীরা যুক্ত হতে থাকেন।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর প্রচেষ্টায় এ কাজ আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে তিনি তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং নিজেরও বাড়ি-সম্পত্তি করেছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে আরডিআরএস সংস্থা তাকে ‘সাদা মনের মানুষ’ সম্মাননায় ভূষিত করে।
মোর্শেদা বেগম জানান, তিনি ফেনীর এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টুপি তৈরি হয়। শুরুতে প্রতি টুপিতে কমিশন পেতেন ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এখন দুটি বায়ারের সঙ্গে কাজ করছেন এবং প্রতি টুপিতে কমিশন পান ৫০ টাকা।
কাজের সুবিধার জন্য তিনি ১৪ জন ফোরম্যান বা এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছেন, যারা গ্রাম থেকে টুপি সংগ্রহ করে দেন। প্রতি মাসে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ৯ লাখ টাকার টুপি বায়ারদের কাছে সরবরাহ করেন তিনি।
থেতরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী শায়লা আক্তার জানায়, তার বাবা নেই। মা মানুষের বাসায় কাজ করেন। একসময় তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষকদের সহযোগিতায় সেই বিয়ে বন্ধ হয়। এরপর পড়াশোনার খরচ চালাতে টুপি বোনার কাজ শুরু করে সে।
রিকশাচালক আমজাদ হোসেনের স্ত্রী শেফালী বেগম বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে টুপি সেলাইয়ের কাজ করছেন। মাসে দুই থেকে তিনটি টুপি তৈরি করে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করেন। এ কাজে তাকে মেয়েরাও সহযোগিতা করে।
থেতরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর আমিন বলেন, তিস্তা নদীপারের অধিকাংশ মানুষ হতদরিদ্র। অনেক শিক্ষার্থী টুপি সেলাই করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরিবারের আর্থিক সহায়তাও করছে। এর ফলে এলাকায় বাল্যবিয়ে ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমেছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কুড়িগ্রাম শাখার উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, মোর্শেদা বেগমের মাধ্যমে অসহায় নারী, দরিদ্র শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধীরা টুপি তৈরির কাজ শিখে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তিনি চাইলে এ কাজে বিসিক থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
উলিপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ লুৎফর রহমান বলেন, মোর্শেদা বেগমের উদ্যোগে অনেক অসহায় নারী ও শিক্ষার্থী আয়ের সুযোগ পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

