সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সফল অভিযান: অস্ত্র ও গুলিসহ আটক কুখ্যাত বনদস্যু বাহিনীর সদস্য

বাগেরহাট প্রতিনিধি :

‎সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, গুলি ও হরিণের মাথাসহ করিম শরীফ বাহিনীর এক সক্রিয় সদস্যকে আটক করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।..

‎সুন্দরবনের গহীনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একটি বিশেষ দল বুধবার বিকেলে পূর্ব সুন্দরবনের আমুরবুনিয়া ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন ড্রেনের খাল এলাকায় সফল অভিযান পরিচালনা করেছে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে কুখ্যাত করিম শরীফ বাহিনীর এক সক্রিয় সদস্য আল-আমিন বাচ্চু হাওলাদারকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।

অভিযানের সময় দস্যুদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালানোর চেষ্টা করলে কোস্ট গার্ড সদস্যরা ধাওয়া করে তাকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাস্থল থেকে ৪টি একনলা বন্দুক, ২০ রাউন্ড তাজা গুলি, ৭৪ রাউন্ড ফাঁকা গুলি, ৭ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি, একটি টেলিস্কোপ, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ওয়াকিটকি চার্জারসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া, বন্যপ্রাণী শিকারের প্রমাণ হিসেবে একটি হরিণের মাথা এবং দস্যুদের ব্যবহারের জন্য মজুদ রাখা চাল ও সিগারেটসহ একটি কাঠের নৌকা জব্দ করা হয়েছে।

এই অভিযানের মাধ্যমে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে দস্যুদের একটি আস্তানা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, যা বনদস্যু নির্মূলে কোস্ট গার্ডের সক্ষমতার একটি বড় নিদর্শন।

‎দীর্ঘদিন ধরে আল-আমিন বাচ্চু হাওলাদার বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনীর সদস্য হিসেবে সুন্দরবন এলাকায় জেলে ও বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং বন্যপ্রাণী নিধনের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন। আটক হওয়ার পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন রাতে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পিসি বাড়ইখালি এলাকায় তার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও উদ্ধার করা হয়েছে দস্যুতা ও বন্যপ্রাণী শিকারের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম। স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, করিম শরীফ বাহিনী সুন্দরবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করছে।

কোস্ট গার্ডের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে ওই অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা দস্যু বাহিনীর নেটওয়ার্ক কিছুটা হলেও দুর্বল হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মতে, এই ধরনের দস্যুরা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, তাই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

‎অভিযানের পর কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও আলামতসহ আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

বর্তমানে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কোস্ট গার্ড স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে তাদের গোয়েন্দা নজরদারি এবং নিয়মিত টহল কার্যক্রম কোনোভাবেই শিথিল করা হবে না। কিছু অসাধু মহল কোস্ট গার্ডের এই দস্যু দমন কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিভিন্ন সময় অপপ্রচার চালিয়ে আসছে, তবে এ ধরনের ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড কোস্ট গার্ডের মূল লক্ষ্য থেকে তাদের বিচ্যুত করতে পারবে না।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে এই অভিযানগুলো আরও জোরদার করা হবে যাতে কোনো অপরাধী চক্র বন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।

‎সুন্দরবন অঞ্চলে দস্যু দমন অভিযানের এই সাফল্য সাধারণ বনজীবী ও জেলেদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। তবে বনদস্যুদের এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে কেবল অপরাধীদের আটক করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের মদতদাতা ও আশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করাও জরুরি।

ভবিষ্যতে এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং বনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কোস্ট গার্ডের এই ধারাবাহিক তৎপরতা প্রমাণ করে যে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং বনদস্যুদের দমনে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

‎এই বাংলা/এমএস

টপিক 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here