সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারায় ‘শরয়ী বিজ্ঞান’ এবং ‘জাগতিক বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আন্তঃসম্পর্ক

সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারায় ‘শরয়ী বিজ্ঞান’ এবং ‘জাগতিক বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আন্তঃসম্পর্কের প্রতিকী ছবি

মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :

ঐতিহাসিক ও সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারায় ‘শরয়ী বিজ্ঞান’ (Religious/Islamic Sciences) এবং ‘জাগতিক বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের’ (Natural/Rational Sciences) মধ্যকার দ্বৈততা ও দ্বিমুখী সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ একাডেমিক বিতর্ক বিদ্যমান। উপনিবেশোত্তর মুসলিম সমাজগুলোতে ঐতিহ্যগত ধর্মীয় শিক্ষা এবং আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যে এক কৃত্রিম দেয়াল বা মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা জ্ঞানচর্চাকে তার মূল নৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।

জ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাস ও সমাজিক দায়বদ্ধতা মুসলিম মনীষী ইমাম গাজালী তাঁর ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে বিজ্ঞানসমূহকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। তিনি চিকিৎসা, গণিত, কৃষি ও প্রযুক্তিগত বিজ্ঞান অর্জনকে সমাজের জন্য ‘ফরজে কেফায়া’ বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কোনো জনপদে যদি অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা প্রযুক্তিবিদ না থাকেন, তবে সে সমাজের সবাই অবহেলার দায়ে দায়ী হবেন। সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুনও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানগুলোকে কেবল প্রারম্ভিক বিদ্যা হিসেবে না দেখে সেগুলোকে ‘স্বীয় সত্তায় উদ্দেশ্যপ্রাপ্ত জ্ঞান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ বিশ্বপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা কুরআনের অন্যতম মৌলিক নির্দেশ।

বিশেষায়নের সংকট ও অপেশাদারিত্বের বিপদ বর্তমান যুগে জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘প্রকৃত বিশেষজ্ঞের অভাব’ (Absence of Genuine Specialization)। ফিকহের গভীর অধ্যয়ন ছাড়া কেবল বই মুখস্থ করে ফতোয়া প্রদানকারীরা প্রকৃত ফকীহ নন। এ বিষয়ে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, এমন এক সময় আসবে যখন ফকীহ বা গভীর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা কমে যাবে, কিন্তু বাহ্যিক পাঠকের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং মানুষ না জেনে মনগড়া ফতোয়া দিয়ে সমাজকে বিভ্রান্ত করবে। ইসলামী আইনশাস্ত্রে ‘ইফতা’ বা ফতোয়া প্রদান অত্যন্ত দায়িত্বশীল একটি আমানত। ইমাম নববী মুফতির জন্য বালেগ হওয়া, চারিত্রিক সততা, ফিকহী বিচারবুদ্ধি, দূরদর্শিতা এবং ওহীর উৎসের সঠিক প্রয়োগ ও ইস্তিনবাত ক্ষমতার মতো কঠোর শর্তারোপ করেছেন। অজ্ঞতার বশে ভুল ফতোয়া দেওয়ার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন যে, না জেনে ফতোয়া প্রদানকারী এবং তদানুযায়ী আমলকারী উভয়েই পথভ্রষ্ট হয়।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

হাদীস বিজ্ঞান ও উপাত্ত যাচাইয়ের মানদণ্ড ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে তথ্যের বিশুদ্ধতা (Data Integrity) এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় সিহাহ সিত্তার ছয় ইমাম অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রাবীদের সমসাময়িকতা ও সরাসরি সাক্ষাৎকে (Liqa’) প্রামাণিকতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। হাদীস বিশারদদের এই কঠোর উপাত্ত যাচাই পদ্ধতি আধুনিক ডেটা সায়েন্স ও হিস্টোরিক্যাল ক্রিটিসিজমেরও মূল ভিত্তি।

ইজতিহাদ, ইস্তিনবাত ও ফিকহী ক্রমবিকাশ শরয়ী আইন প্রণয়ন ও নতুন সমস্যার সমাধানে ‘ইজতিহাদ’ (সর্বোচ্চ চেষ্টা) এবং ‘ইস্তিনবাত’ (উৎস থেকে সূক্ষ্ম অর্থ উদ্ধার) অপরিহার্য। সুনানে তিরমিযী ও আবু দাউদে বর্ণিত হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর বিখ্যাত হাদীসে কিয়াস ও ইজতিহাদের সقم স্বীকৃতি রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী বিচারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কুরআন, মুতাওয়াতির হাদীস, খবর-ই-আহাদ, ইজমা এবং সবশেষে কিয়াসের সুনির্দিষ্ট ক্রমধারা প্রবর্তন করেন। হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে হিজাজের ‘আহলুল হাদীস’ (ইমাম মালেক) এবং ইরাকের ‘আহলুর রায়’ (ইমাম আবু হানিফা) স্কুলের পাশাপাশি ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদের হাত ধরে চার প্রধান মাযহাব পূর্ণতা লাভ করে। এছাড়া যাইদী মাযহাব এবং শিয়া ইমামিয়্যা ফিকহ (যেমন: আল-কুলাইনীর ‘আল-কাফী’) নিজস্ব উসূলী কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইবনে খালদুন ব্যাখ্যা করেছেন যে, হিজরী পঞ্চম শতকের পর বিশৃঙ্খলা রোধে চার মাযহাবের প্রাতিষ্ঠানিক অনুসরণ (তাকলীদ) শরয়ী আইনের ধারাকে সুরক্ষা প্রদান করেছে।

সমকালীন চ্যালেঞ্জ: ফিকহুল নওয়াজিল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), জিন এডিটিং (বায়োএথিক্স) এবং ইসলামিক ফাইন্যান্সের (সুকুক, মুদারাবা, মুশারাকা) মতো জটিল সমস্যাগুলো মোকাবেলায় ‘সমষ্টিগত ইজতিহাদ’ (Collective Ijtihad) এবং আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—এআই প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে একে ‘মাকাসিদুশ শরীয়াহ’-র ৫টি মৌলিক স্তম্ভ (বুদ্ধি, জীবন, সম্পদ, গোপনীয়তা ও নৈতিকতা) দিয়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এআই-এর নিজস্ব কোনো আইনি ব্যক্তিত্ব না থাকায় এর ভুল বা ক্ষতির দায়ভার সফটওয়্যার ডেভেলপার বা প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়, যা ফিকহী মূলনীতি ‘আল-গুরমু বিল গুরমি’ (সুবিধা ভোগের দায় ঝুঁকি বহনকারীর ওপর)-এর সরাসরি প্রয়োগ।

উপসংহার ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে দ্বীনী ও জাগতিক বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই; বরং উভয়ের লক্ষ্য হলো মানবকল্যাণ এবং পৃথিবীকে সঠিকভাবে আবাদ করা। আধুনিক শিক্ষা কারিকুলামে প্রযুক্তি ও ইসলামী নীতিশাস্ত্রের সমন্বয় এবং OIC-এর অধীনে স্থায়ী গবেষণা কমিশন গঠন করার মাধ্যমেই কেবল বর্তমান যুগের জ্ঞানগত ও নৈতিক সংকট উত্তরণ সম্ভব।

এই বাংলা/এমএস

টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here