সঙ্কট উত্তরনের পথে ইসলামী ব্যাংক: পুরানো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বিশেষ প্রতিনিধি :

 

টানা সাত বছর বিশ্বের সর্ববৃহৎ সিন্ডিকেট ডাকাতির কবলে ছিল ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। আর্থিক খাতের সব প্যারামিটারে শক্তিশালী এই ব্যাংক ৭ বছরের সিন্ডিকেট ডাকাতি ও লুট-তরাজে অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গত দেড় বছরে ব্যাংকটি সংকট কাটিয়ে উঠার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সর্ববৃহৎ শরীয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামি ব্যাংক, বাংলাদেশ, পিএলসি পুনরায় কোনো লুটেরার কবলে পরলে দেশের পুরো আর্থিক খাত নিয়ে ধসে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট অনেকে।

মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড বর্তমানে পিএলসি প্রতিষ্ঠার অল্প কয়েক বছরের মধ্যে সাফল্যের শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছে। দেশের রপ্তানি নির্ভর প্রধান প্রধান শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই গড়ে উঠেছে এই ব্যাংকটির বিনিয়োগে। রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্য, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বাণিজ্যে, বিনিয়োগে, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে, ব্যাংকিং সেবার বিকাশে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধা বঞ্চিত নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়নে এই ব্যাংকটি সর্ব শীর্ষ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। ধর্ম অনুভূতিতে বিশ্বাসী গ্রামের ভিক্ষুক থেকে শহরের কোটিপতি আমানতকারীদের নির্ভরতার শেষ গন্তব্য পরিণত হয়েছে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। এছাড়া, ইসলামি ব্যাংকের ধারাবাহিক সফলতার পথ ধরে বাংলাদেশে দ্রুত প্রসারিত হয়েছে ইসলামি ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দ্রুত প্রসারিত হওয়াই সময়ের ব্যবধানে বিপদের কারণ দাঁড়ায়।

সব প্যারামিটারে শক্ত অবস্থানে থাকা ইসলামি ব্যাংক ভয়াবহ ধরনের লুট-তরাজের কবলে পড়ে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি। লুট-তরাজ চলেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশের রাষ্ট্রীয় সব যন্ত্র একসাথে ব্যবহার করে, তথাকথিত ব্যবসায়ী এস. আলমের মাধ্যমে এ ধরনের অভিনব ও সর্ববৃহৎ সিন্ডিকেট ”ব্যাংক ডাকাতি”র ঘটনা ঘটায়। যা আধুনিক ব্যাংক ডাকাতরা এখনো চিন্তাও করতে পারেনি। হাসিনা, এস আলমীয় এ মডেলের লুটপাট আর কয়েক মাস চলতে থাকলে দেশের পুরো আর্থিক খাত নিয়ে ধ্বংসে পড়ত বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামি ব্যাংক, বাংলাদেশ।

সৌভাগ্যক্রমে ২০২৪-এর ৫ আগস্টের দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ইসলামি ব্যাংক দেশের আর্থিক খাত নিয়ে ধসে পড়া থেকে রক্ষা পায়। দেশের এই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সাধারণ আমানতকারী, প্রবাসী বাংলাদেশি, আমদানি-রপ্তানিকারক ও ক্ষুদ্র মাঝারি, বৃহৎ আমানতকারী ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ইসলামি ব্যাংক। গত দেড় বছরে বৃহত্তর ক্ষত কাটিয়ে পুরোদমে বাণিজ্যে ফিরতে শুরু করেছে এই ব্যাংকটি।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ইসলামি ব্যাংক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্যারামিটারে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBPLC) গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GDP), কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, তৈরি, পোষাক, স্পিনিং শিল্পসহ রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় সংগ্রহে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, কর্মসংস্থান ও বৃহৎ শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ (SME), গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নে ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে এই ব্যাংক।

এছাড়া এটি দেশের বৃহত্তর শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং অন্যান্য ইসলামি ব্যাংকিংয়ের পথিকৃৎ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ইসলামিক ব্যাংক সমূহকে পলিসিগত সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি এক্সপার্টদের কদরও বাড়ছে।

শুরু থেকে ধারাবাহিক সফলতায় বিশ্বের সেরা ১০০০ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় জায়গা করে নেয়া, ৩ কোটি গ্রাহকের এ ব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় পিলার। এ পিলারের স্থায়িত্ব বা ধসে যাওয়ার সাথে নির্ভর করে পুরো দেশের ইসলামিক ব্যাংকিং ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।

কয়েকজন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামি ব্যাংক বড় ধরনের সংকট উত্তরনের পথে রয়েছে, এ অবস্থায় আবার কোনো কারণে যদি ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আস্থা ও অস্তিত্ব সংকটে সংকটাপন্ন হয়, তখন পুরো দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিপর্যয় দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রায় ৫ কোটি গ্রাহক নিয়ে ইসলামি ব্যাংকিং মার্কেট। বিশাল জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্বের এ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোন ধরনের আস্থা অস্তিত্বের সংকট দেখা দিলে, তা কোনো সরকারের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here