কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ১৮ দিনে নদীবক্ষে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় শতাধিক হেক্টর আবাদি জমি। তীব্র ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে সাত শতাধিক পরিবার। ইতিমধ্যে সুখেরবাতি আদর্শগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর গেন্দার আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা গিলে ফেলেছে ব্রহ্মপুত্র নদ।
বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও কয়েকশ’ পরিবার। নদের তীরবর্তী মানুষজন এখন ভাঙন আতঙ্কে দিনরাত পার করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মাসে উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি, চর গেন্দার আলগা, সোনাপুর, পশ্চিম খেদাইমারী, ঘুঘুমারী ও নামাজের চর এলাকায় অন্তত ৭২০টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীতে তলিয়ে গেছে। এসব নিঃস্ব পরিবার এখন রাস্তার ধারে বা অন্যের জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই ভাঙন চললেও সরকার এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদে বসতভিটা হারিয়ে রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন চর ঘুঘুমারীর বাসিন্দা মোছাঃ রহিমা বেওয়া। তিন মেয়েকে নিয়ে সংসারে একাই লড়াই করছেন। রহিমা বেগম জানান, তার কোনো জায়গা-জমি নেই। বর্তমানে যেখানে আছেন সেখানে কতদিন থাকতে পারবেন তাও তিনি জানেন না।
চর ঘুঘুমারীর আরেক ভুক্তভোগী মোঃ সরবেশ পাগলা জানান, তার স্ত্রী ও মেয়ে দুজনেই প্রতিবন্ধী। গত দেড় বছরে তিনি তিনবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন। বারবার বসতভিটা পরিবর্তন করা তার জন্য খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুখের বাতি চরের বাসিন্দা মোঃ ফুলচান জানান, তার বাড়ি চারবার নদীতে গেছে। বর্তমানে অন্যের জায়গায় কোনোমতে ঠাঁই নিলেও সেখান থেকে সরিয়ে দিলে কোথায় যাবেন তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
চর গেন্দার আলগা এলাকার মোছাঃ সুন্দরী খাতুন জানান, এ পর্যন্ত তার বসতবাড়ি পাঁচবার ভেঙেছে। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে যেখানেই আশ্রয় নেন, সেখান থেকেই কয়েকদিন পর তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, তার স্বামী অসুস্থ। পরিবারের আয় করার কেউ নেই।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
সুখের বাতি চরের মোছাঃ আনজুয়ারা জানান, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর প্রতিবন্ধী ছেলে ও তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে নিয়ে তাকে অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে। বারবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে তিনি এখন দিশেহারা। তিনি অবিলম্বে নদী ভাঙন বন্ধের দাবি জানান।
একই এলাকার মোছাঃ হাজেরা বেওয়া জানান, তার শেষ সম্বলটুকুও নদীতে গেছে। ঘর তোলার সামর্থ্য না থাকায় তিনি এখন রাস্তার পাশে ঝুপড়ি বেঁধে আছেন। তিনি দ্রুত ভাঙনরোধে কাজ করার দাবি জানান।
পেশায় মসজিদের ইমাম মোঃ কুরবান আলী মুন্সী জানান, ভিটেমাটি হারিয়ে তিনি নানার জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তিনি সব সময় উচ্ছেদ আতঙ্কে ভোগেন।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোঃ সমসের আলী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ৭২০টি পরিবারের তালিকা ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম সাইদুর রহমান দুলালের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সারা বছরজুড়েই এখানে কমবেশি ভাঙন চলতে থাকে।
কুড়িগ্রাম জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান এ বিষয়ে জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বরাদ্দ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে বর্তমানে জরুরি কাজের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

