
মোহাম্মদ মোশারাফ হোছাইন খান :
মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও কেবল টাকা পাচারের উদ্দেশ্যে অসাধু একটি চক্র বিদেশ থেকে মাছ আমদানি করছে। মাছ আমদানির আড়ালে বছরে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ভারত, বার্মা, উরুগুয়ে, থাইল্যান্ড, স্পেন, আরব আমিরাত, পাকিস্থানস্থানসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। ভারত, বার্মা, উরুগুয়ে, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশের মাছ রপ্তানি মূল্যের সাথে কোন সামঞ্জস্য খুজে পাওয়া যায় নি বাংলাদেশের প্রদির্শিত আমদানি মূল্যের সাথে। পাচারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বন্দরগুলোর কাস্টমস সমূহে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিপুল অংকের রাজস্বও ফাঁকি দিচ্ছে এসব আমদানিকারক। আমদানি কারকের ব্যাংক, সিএন্ডএফ ও কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ কাজে সহযোগীতিা করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর বার্ষিক আমদানি প্রতিবেদন, এনবিআরের বিভিন্ন প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান বুরোর ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রকাশিত আমদানি প্রতিবেদনের তথ্য সূত্রে জানা যায়, কয়েকটি দেশ থেকে সব মিলে মাছ ও মাছজাত পণ্য আমদানি করা হয়েছে ৯ কোটি ৯২ লাখ ৯৫ হাজার ৭১১ কেজি বা ৯৯ হাজার ২৯৫.৭১১ মে. টন যার এর মূল্য দেখানো হয়েছে ১১৯৭ কোটি ৯৩ লাখ ৩০ হাজার ৯’শ ১৮ টাকা। এর মধ্যে সব চেয়ে বেশী আমদানি হয়েছে ভারত ও বার্মা থেকে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
এদিকে, ইপিবির ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারী-৮ মাসের পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে এই সময় মাছ ও মাছজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে ২৭ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার ৭.২ মার্কিন ডলারের।
ভারত থেকে ৯ টি এইচ এস কোডের মাধ্যমে মাছ ও মাছ জাত পণ্য আমদানি ৬ কোটি ২৫লাখ ৯০ হাজার ৩৪৬ কেজি বা ৬২ হাজার ৫ শ ৯০ কেজি বা ৬২ হাজার ৫ শ ৯০.৩৪৬ মে.টন, ২.৫ কেজি ওজনের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ১ লাখ ৭৫হাজার ১শ ৫৭ পিছ মাছ আমদানি দেখানো হয়েছে। মোট দাম দেখানো হয়েছে ৭২৫ কোটি ১৯৭ লাখ ৮২ হাজার ৬ শ ৭৪ টাকা।
৯টি এইচ এস কোডের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পণ্য আমদানি হয়েছে, ০৩০৩৫৫৯০,০৩০৫৫৫৯৯০ ০৩০২১৯৯০, ০৩০৩৫৪৯০ এই চারটি এইচ এস – কোডের মাধ্যমে। এই চারটি এইচ এস কোডে আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ ৬ কোটি ২৫ লাখ ১১ হাজার ৪৪৫ কেজি বা ৬২ হাজার ৫ শ ৭৩.২২৪ মে.টন। এর আমদানি মূল্য প্রায় ৭১৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সব চেয়ে বেশী আমদানি করা হয়েছে ০৩০৩৫৫৯০ এইচ এস কোড এর মাধ্যমে জ্যাক এন্ড হর্স ম্যাকারেল ট্রাচুরাস প্রজাতির মৎস্য। এই জাতীয় মাছ আমদানি করা হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ১৪ হাজার ৫শ ১০ কেজি বা ২৮ হাজার ১শ ১৪.৫১ মে. টন, যার আমদানি মূল্য ২৭০ কোটি ৮২ লাখ ৩৪ হাজার ৪শ ৬৭ টাকা। পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রদত্ত তথ্যমতে প্রতি কেজি মাছের মূল্য প্রায় ১০১ টাকা। ইন্ডিয়ার বিভিন্ন রপ্তানি মার্কেটে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সাইজ ভেদে প্রতি কেজি মাছের সর্ব নিম্ন রপ্তানি মূল্য ১.২০-৪ মার্কিন ডলার (সিএন্ডএফ মূল্য)। এ হিসাবে প্রতি কেজি মাছের মূল্য দাড়ায় ১৪৪.২৫ (সিএন্ডএফ মূল্য) টাকা। বাংলাদেশে এই এইচ এস কোডে কাস্টমস ডিউটি হচ্ছে ৩৩ শতাংশ। ইন্ডিয়ার রপ্তানি বাজার মূল্য এবং আমদানির বিধি অনুসারে কাস্টমস ডিউটি যোগ করে এই এইচ এস কোডে ১০১ টাকায় আমদানি অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।
এর পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এইচ এস কোড ০৩০৫৫৫৯৯০ এর অধিনে আমদানি করা পণ্য। এই কোডে বিভিন্ন ধরনের শুটকি আমদানি করা হয়েছে ১ কেটি ১০ লাখ ৮৯ হাজার ৩শ ৬৫ কেজি, এর মূল্য দেখানো হয়েছে ২৪৯ কোটি ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৬শ ৬৪ টাকা। প্রতি কেজি শুটকি মাছর আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে ২২৪. ৭১ টাকা। ইন্ডিয়ার সরকারী ভাটা সূত্রে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে প্রতি কেজি ড্রাই ফিস রপ্তানির গড় মূল্য ছিল ১.৬৮ মার্কিন ডলার। এই অর্থ বছরে দেশটি মোট ড্রাই ফিস রপ্তনি করেছে ২২ হাজার ৩ শ ৮১ মে. টন। এর মধ্যে বাংলাদেশেই রপ্তানি হয়েছে ১১ হাজার ৮৯.৩৬৫ মে. টন। তবে ইন্ডিয়ার শুটকি রপ্তানিকারকদের অনেকের সাথে যোগাযোগ করে এবং আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ড্রাই বোম্বাই ডাক ফিস বা লইট্টা শুটকির ইন্ডিয়ায় রপ্তানির সর্ব নিম্ন মূল্য ছিল দাম ২ ডলারের উপরে। অন্যান্য শুটকি মাছের দাম আরো বেশীও ছিল। শুধু কাচকি বা এ জাতীয় শুটকি মাছের দাম ২ ডলারের নিচে ছিল। ০৩০৫৫৫৯৯০ এই এইচ এস কোডে আমদানি কৃত পণ্যের উপর বাংলাদেশ কাস্টমসের ডিউটির মোট পরিমান হচ্ছে ৫৮.৬০ শতাংশ।
মৎস্য খাত বিশেষজ্ঞ অনেকে জানিয়েছেন, দেশের চাহিদা পূরণ করে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমান নানা প্রজাতির শুটকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। যেখানে আমাদের দেশের শুটকি বিদেশে উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন, সেখানে মাছের দেশে শুটকি আমদানি ডলার পাচার ছাড়া আর কিই বা হতে পারে। তারা আরো বলেছেন, লইট্টা ছুড়িসহ বিভিন্ন দামী শুটকি বাংলাদেশে একটি গ্রুপ আমদানি করে থাকে। এসব দামী শুটকি ২২৪.৭১ টাকা করে আমদানি অসম্ভব।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ০৩০২১৯৯০ এইচ কোডে আমদানি কৃত পণ্য। এই কোডে আমদানি করা হয়েছে রুই, কাতলা, কার্প জাতীয় মাছ। এই এইচ এস কোডের মাধ্যমে পন্য আমদানি করা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৫১ হাজার ১১ কেজি বা ২২ হাজার ৫১.০১১ মে.টন, এর আমদানি মূল্য ১৭৩ কোটি ৯১ লাখ ৯৭ হাজার ৪’শ ৭৬ টাকা। প্রতি কেজি রুই, কাতলা মাছের সিএন্ডএফ হিসাবে আমদানি মূল্য ছিল ৭৮.৮৭ টাকা। ইন্ডিয়ার রপ্তানি বাজার এবং রপ্তা-ি নর বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য মতে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রুহু, এ জাতীয় মাছের রপ্তানি মূল্য ছিল বান্ধ কোয়ান্টিাটিতে (পরিমান) ১১০-১৬০ রুপি (কোয়ালিটি, শিপম্যান্টের ধরন, দেশভেদে দামের পার্থক্য)।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে প্রকাশিত পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, দেশে ২৩ প্রজাতির মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪৩ লাখ ৮৯ হাজার ৮৬০ মে. টন। বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬২৩ টন। ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪৮৩ মে.টন মাছ আহরন ও উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে তিন প্রজাতির কার্প মেজর কার্প (রুই, কাতলা, মৃগেল, আদার কার্প), আদার কার্প (কালি বাওস, বাটা, খানিয়া) এক্সোটিক কার্প (সিলভার, গ্রাস, কমন, মিরর, বিগ হেড, ব্লাক কার্প) মাছ উৎপাদন হয় ১৮ লাখ ৬০ হাজার ৩৩৫ মে. টন।
মৎস্য অধিদপ্তরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরিচালক (মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ) ড. মো: খালেদ কনককে দেশে চাহিদাতিরক্তি রুই বা কার্প জাতীয় মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, বিদেশেও উল্লেখযোগ্য পরিমান এই মাছ রপ্তানি হচ্ছে, এর পরও দেশে নাম মাত্র মূল্যে রুই বা এই জাতীয় মাছ কেন আমদানি করা হচ্ছে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দেশীয় স্বার্থ বিবেচনা করে, মাননীয় মৎস্য উপদেষ্টার ঐকান্তিক ইচ্ছায় দেশে উৎপাদিত হয় এমন সব মাছ আমদানিতে সংকোচন নীতি গ্রহণ করতে পেরেছি। যেহতু মৎস্য আমদানি নিষিদ্ধ নয় সে কারণে আমদানি নিষিদ্ধ করা সম্ভবও নয়। দেশীয় মৎস্য চাষীদের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে এ সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, স্বাদের দিক থেকে বাংলাদেশের রুই ও কার্প জাতীয় মাছের বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর দেশীয় মাছের বিদেশের মার্কেটগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্রান্ডিং করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আশা করছি আমাদের দেশের মৎস্য রপ্তানি হয়ে উঠবে বৈদেশিকি মুদ্রা অর্জনের বড় একটি মাধ্যম। এদিকে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে আমদানিকৃত এসব মাছের ক্যামিক্যাল ও ব্যাক্টরলজিক্যাল পরিক্ষা করা জরুরী। এসব মাছে উচ্চমাত্রার ভারি পদার্থ থাকা অস্বাভাবিক নয়। জনস্বাস্থ্য ও স্বার্থ রক্ষায় এসব পরীক্ষা করা জরুরী।
চতুর্থ আবস্থানে রয়েছে ০৩০৩৫৪৯০ এইচএস কোড ম্যাকেরেল (স্কম্বার স্বন্ত্রাস, স্কম্বার অস্ট্রালাসিকাস, স্কম্বার জাপোনিকাস), এক্সসিএল মোড়ানো/ক্যান আমদানি করা হয়েছে ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ৫শ ৫৯ কেজি। এর আমদানি মূল্য ২৬কোটি ৩লাখ ৬২ হাজার ৯শ ৮৯ টাকা। এই এইচ এস কোডের কাস্টমস ডিউটি ৩৩ শতাংশ। এই এইচ কোডের পণ্যের দাম ০৩০৩৫৫৯০ এইচ এস কোডের অনুরুপ।
এছাড়া আরো পাঁচটি এইচ এস কোডে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আমদানি করা হয়েছে ৫ কোটি ৩৫ লাখ ৫৯ হাজার ৮২ টকার। এই পাঁচটি এইচ এস কোডের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যের আমদানি মূল্যে ব্যাপক অসমাঞ্জস্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য খাত সংশ্লিস্ট অনেকে। এদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের ইন্ডিয়ার মৎস্য রপ্তানি সংক্রান্ত সরকারি
একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশে মোট মাছ ও মাছজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে ১৪ হাজার ৮শ ৭০.০৪ মে.টন। এর রপ্তানি মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৮.৮০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আমদানি ডাটা বেজের সাথে ভারতের মাছ ও মাছজাত পণ্যের ডাটা বেজের পার্থক্য ৪৭ হাজার ৭শ ২০.৩০৬ মে.টন। এদিকে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন তথ্যমতে, ইন্ডিয়ার পরিসংখ্যানে রপ্তানি মূল্য দেখানো হয়েছে প্রতি কেজি ২.৬০ মা.ডলার বা ১১৫ টাকা করে দর হিসাব করা হলে প্রতি কেজির দাম হয় ২৯৯ টাকা। বিপরীতে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে প্রতিকেজি মাছের আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে, ১১৫ টাকা। এখানে বাংলাদেশের আমদানি মূল্যের সাথে ইন্ডিয়া বিশাল ব্যবধান রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হন নি। চলবে-
এই বাংলা/এমএস
টপিক
