খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি :
জীবনের প্রতিটি মোড়ে সাহস, অধ্যবসায় ও দায়িত্ববোধের অটুট দৃষ্টান্ত শ্রীলা তালুকদার। রাঙামাটিতে জন্ম; তবে বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব কেটেছে রামগড়ের শান্ত, সরল পরিবেশে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত রামগড়ে পড়াশোনা শেষে ১৯৭১ সালে পরিবার খাগড়াছড়িতে আসে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়াই ছিল তার শিক্ষা ও স্বপ্নপথের নতুন সূচনা।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
১৯৭৬ সালে মেট্রিক, ১৯৭৮ সালে এইচএসসি ও ১৯৮১ সালে ডিগ্রি শেষ করে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন এবং ১৯৮৪ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন শ্রীলা তালুকদার। দুই বছর পর ১৯৮৭ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নতুন পরিবার, নতুন দায়িত্ব—সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জের। স্বামীর চাকরি দূরবর্তী স্থানে থাকায় বেশিরভাগ সময় সন্তান লালন-পালন ও সংসারের দায়িত্ব তাকে একাই সামলাতে হয়েছে। তবুও তিনি থেমে যাননি; দৃঢ়তা আর দায়িত্ববোধ তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
১৯৯৮ সালে সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়ে তিনি বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দেন। পরে ২০০৬ সালে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পান এবং টানা ১৪ বছর সততা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২০ সালে অবসর গ্রহণের পরও থেমে থাকেননি; সমাজসেবা ও বিভিন্ন সংগঠনে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ গার্লস গাইডস এসোসিয়েশন খাগড়াছড়ি জেলার জেলা গাইড কমিশনার। একই সঙ্গে ‘আলো’ এনজিওর সহ-সভাপতি হিসেবেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক, প্রশাসনিক নেতা এবং সংগ্রামী নারী হিসেবে যেমন সফল, তেমনি একজন মা হিসেবেও অনন্য। প্রথম সন্তানের জন্মের পরও তিনি চাকরি ও সংসারের ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যান। পরে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম এবং তার পর জমজ এক ছেলে ও এক মেয়ের আগমনে পূর্ণ হয় তার পরিবার। সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
আজ তার সন্তানরা তাঁর জীবনের সাফল্যের জীবন্ত সাক্ষ্য—
-
বড় মেয়ে ঈপসিতা চাকমা—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষায় অনার্স ও মাস্টার্স; বর্তমানে খাগড়াছড়ি পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
-
তার স্বামী ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা—আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার।
-
দ্বিতীয় সন্তান অর্নব চাকমা—কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস; ৩৯তম বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী সার্জন হিসেবে কর্মরত। তার স্ত্রীও একজন চিকিৎসক।
-
জমজ সন্তান—মেয়ে লোকপ্রশাসনে এবং ছেলে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছে; দুজনই বর্তমানে চাকরি প্রত্যাশী।
শ্রীলা তালুকদারের গল্প শুধু সাফল্যের নয়—এটি আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ, দৃঢ় সংকল্প ও ভালোবাসার এক উজ্জ্বল অধ্যায়। একা হাতে সংসার ও সন্তান সামলে শিক্ষকতা এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সহজ ছিল না; কিন্তু তিনি অদম্যভাবে সবকিছু সামলে আজ দাঁড়িয়ে আছেন এক অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে।
তার সন্তানরা আজ প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত—আর প্রতিটি অর্জনের পিছনে আছে মায়ের অবিচল পরিশ্রম, দিকনির্দেশনা ও ভালোবাসা।
শ্রীলা তালুকদারের জীবন দেখিয়ে দেয়—একজন নারী যদি সাহস, অধ্যবসায় ও ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যায়, তবে অসাধ্যও সম্ভব হয়ে ওঠে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

