পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি ফুলবাড়ীর তালেরতল সেতু, ড্রামের ভেলায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার ২০ হাজার মানুষের

২ কোটি ৮৪ লাখ টাকার প্রকল্পে তিন বছরের বেশি সময় অতিবাহিত; শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম দুর্ভোগ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের খোচাবাড়ী তালেরতল এলাকায় নির্মাণাধীন ৪২ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পাঁচ বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের তিন বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থাকায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন ড্রামের ভেলায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পারাপার করছেন। এতে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডসহ জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে তালেরতল এলাকার পুরোনো সেতুটি ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে অস্থায়ীভাবে দড়ি ও কাঠের সাঁকো নির্মাণ করা হলেও ২০১৯ সালের বন্যায় সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২১ সালে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও এখনো তা শেষ হয়নি।

স্থানীয় প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে তিন বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিনটি স্প্যানের মধ্যে মাত্র একটি স্প্যানের ডেক (স্ল্যাব) নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি দুটি স্প্যানের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করায় নির্মাণকাজের গতি অত্যন্ত ধীর।

সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষ প্রতিদিন অস্থায়ী ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পার হচ্ছেন। বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রায়ই ভেলা উল্টে মানুষ পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেক শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধ আতঙ্কে পারাপার করতেই সাহস পান না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় বসতবাড়ি, ফসলের মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার কিংবা উপজেলা সদরে যেতে হলে এই ছড়া পার হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। বিকল্প হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি রক্ষা বাঁধ থাকলেও সেটি অনেক দূরের এবং চলাচলের জন্য কষ্টকর। বর্তমানে ওই বাঁধেরও মেরামতকাজ চলায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

কৃষকদের ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এবং গবাদিপশু ড্রামের ভেলায় পারাপার করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মো. মতিয়ার সরকার বলেন, “প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই ছড়া পারাপারে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও কৃষিক্ষেত্রে পড়ছে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা প্রতিকূল আবহাওয়ায় ঝুঁকির কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। চার বছর আগে কাজ শুরু হলেও অগ্রগতি খুবই ধীর। দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা প্রয়োজন।”

ইউপি সদস্য মো. আব্দুল মালেক বলেন, “সেতুর কাজ শুরু হলেও মানুষের পারাপারের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ড্রামের ভেলা তৈরি করেছি। কিন্তু এটি দিয়ে এত মানুষের নিরাপদ পারাপার সম্ভব নয়। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।”

স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন সর্দার বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই ড্রামের ভেলায় পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ঘটে। সাইকেল, মোটরসাইকেল, টাকা-পয়সা পানিতে পড়ে যায়। গবাদিপশুও ভেলায় পার করতে হয়। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছি।”

এ বিষয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘ বিলম্বের কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, “মাত্র একটি স্প্যান নির্মাণ করতেই যদি পাঁচ বছর লেগে যায়, তাহলে পুরো সেতুর কাজ শেষ হতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?”

এই বাংলা/এমএস

টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here