গলাচিপায় বাল্যবিবাহের অভিযোগ, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর আকুতি-‘আমি পড়াশোনা করতে চাই’

গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি :

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কল্যাণ কলস (খারিজ্জমা) গ্রামের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক বাল্যবিবাহে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী ১৪ বছর ৫ মাস ১৬ দিন বয়সী মোসাম্মৎ জান্নাতুলের দাবি, ভয়ভীতি, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক চাপের মাধ্যমে তাকে বিয়েতে রাজি করানো হয়েছে। এখন সে সংসার নয়, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জান্নাতুলের জন্ম ১ জানুয়ারি ২০১২। কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা গেলে পরিবারের দায়িত্ব নেন তার দাদি ফুল বানু। পরবর্তীতে তার মা রাহিমা খাতুন বিদেশ থেকে দেশে ফিরে প্রতিবেশী নজরুল সিকদারকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, এরপর জান্নাতুলকে তার মা, সৎ বাবা ও বড় বোনের সহযোগিতায় প্রাণনাশের হুমকি, মারধর ও বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে বিয়েতে সম্মত হতে বাধ্য করা হয়। এ সময় তার সম্মতির একটি ভিডিওও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, প্রকৃত জন্ম নিবন্ধনে জান্নাতুলের বয়স ১৮ বছরের কম হলেও ২০২৬ সালের ৭ জুন পটুয়াখালীতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বয়স ১৮ বছর দেখিয়ে হলফনামা তৈরি করা হয়। পরে একই দিন পটুয়াখালী জেলার জৈনকাঠী ইউনিয়নের আলকাছ বিশ্বাসের ছেলে মোহাম্মদ কাউসার (২১)-এর সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিষয়টি জানাজানি হলে ৮ জুন জান্নাতুলের দাদি ফুল বানু গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হককে অবহিত করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. রিয়াজ খান ও কলাগাছিয়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা বাল্যবিবাহ ঠেকানোর উদ্যোগ নিলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় জান্নাতুলের দাদি ফুল বানু বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ৭, ৮, ৯ ও ১১ ধারায় গলাচিপার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে অভিযুক্তরা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন লাভ করেন।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর থেকে এবং অভিযুক্তরা জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জান্নাতুল ও তার দাদিকে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জান্নাতুল বলে, “আমি কোথায় যাব? আমার বাবা নেই। আদালতে যদি আমি সুষ্ঠু বিচার না পাই, আমি আত্মহত্যা করব।”

সে আরও বলে, “আমি পড়াশোনা করতে চাই। মানুষের মতো মানুষ হতে চাই। স্বাবলম্বী হতে চাই। আমাকে যেন আমার শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।”

এলাকাবাসীর মতে, বাল্যবিবাহ শুধু একটি শিশুর শৈশবই কেড়ে নেয় না, তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তারা আশা করছেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here