কুড়িগ্রাম সীমান্তে ফেলানী হত্যার ১৫ বছর: আজও অধরাই বিচার

0
193
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফ সদস্যের গুলিতে নিহত হন কিশোরী ফেলানী খাতুনের কফিনবন্দী লাশ / ছবি - এই বাংলা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :


কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ, বুধবার (৭ জানুয়ারি)। ২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে নিহত হয় ১৩ বছরের কিশোরী ফেলানী। দীর্ঘ ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন কাটছে তার পরিবারকে।

জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারি গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম নুরু ছিলেন দরিদ্র পরিবারের মানুষ। সংসারের অভাব-অনটন দূর করতে প্রায় ১২ বছর আগে দেড় বছরের শিশু ফেলানীকে কোলে নিয়ে স্ত্রী জাহানারাসহ অবৈধ পথে ভারতে পাড়ি জমান তিনি। ভারতের আসাম রাজ্যের বঙ্গাইগাঁও এলাকায় বসবাস করে ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন নুরু ও তার স্ত্রী।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

এরই মধ্যে বড় হয়ে ১৩ বছরের কিশোরী হয় ফেলানী। বাংলাদেশে তার বিয়ে ঠিক হলে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার উদ্দেশে রওনা দেন নুরুল ইসলাম। যাওয়ার সময় মেয়েকে বিয়ের সাজে সাজিয়ে দেন মা জাহানারা। ওইদিন সন্ধ্যায় সীমান্তে পৌঁছে দালালের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চুক্তি হয়। দালালরা তাদের ভারতের ভেতরে একটি বাড়িতে রাত কাটাতে দেয়।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে প্রথমে কাঁটাতার পার হন বাবা নুরুল ইসলাম। এরপর ফেলানী মই বেয়ে কাঁটাতারের ওপরে উঠতেই ভারতের ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের এক বিএসএফ সদস্য খুব কাছ থেকে গুলি করলে কাঁটাতারে ঝুলে পড়ে তার নিথর দেহ। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকার পর বিএসএফ মরদেহ নামিয়ে নেয়। ময়নাতদন্ত শেষে একদিন পর বিজিবির মাধ্যমে মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। মামলায় ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ও মামা হানিফ সাক্ষ্য দেন। কিন্তু ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়।

কুড়িগ্রাম সীমান্তে ফেলানী হত্যার ১৫ বছর, বিচারের অপেক্ষায় পিতা-মাতা

রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের দাবি জানালে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু হয়। ২০১৫ সালের ২ জুলাই দ্বিতীয় দফায়ও অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় আদালত। এরপর একই বছরের ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একাধিকবার শুনানির তারিখ পেছানো হয়। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এখনো মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

ফেলানীর বাবা মো. নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, “আমার মেয়েকে হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেল, কিন্তু আজও বিচার পেলাম না। আমার চোখের সামনে আমার মেয়েকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমি চাই সীমান্তে আর কোনো হত্যা না হোক। জীবিত থাকতে আমার মেয়ের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।”

ফেলানীর ছোট ভাই মো. আক্কাছ আলী বলেন, “আমি তখন ছোট ছিলাম। আজও আমার বাবা-মা কাঁদেন। ভাই হিসেবে আমার একটাই দাবি—আমার বোনের হত্যার বিচার চাই।”

প্রতিবেশী মো. শরীফ মিয়া বলেন, “১৫ বছর ধরে ফেলানী হত্যার বিচার ঝুলে আছে। যে সরকারই আসুক, সবার আগে ফেলানী হত্যার বিচার নিশ্চিত করা উচিত।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচির নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here