কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
কুড়িগ্রামের দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যবর্তী চরাঞ্চলে এখনো বাল্যবিয়ে একটি প্রচলিত সামাজিক বাস্তবতা। যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংকট, দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক পরিবার মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
চরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌকা। নৌকা থেকে নেমে জমির আইল ধরে হাঁটতে হয়। বর্ষায় অনেক পথ পানিতে তলিয়ে থাকায় চলাচল আরও কষ্টকর হয়ে পড়ে। অধিকাংশ গ্রামে একটি মাত্র বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত।
স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, “এখানে বিয়ে মানেই প্রায় বাল্যবিয়ে। অন্তত ৯০ শতাংশ মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের শিকার হয়। অনেক সময় এমন বয়সে বিয়ে হয়, যা খুবই উদ্বেগজনক।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৮ বছর পার হওয়ার পর মেয়েদের বিয়ে হওয়া বিরল ঘটনা। বয়স বেড়ে গেলে ভালো পাত্র পাওয়া কঠিন—এমন ধারণা থেকেই অধিকাংশ পরিবার কম বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়।
চরের এক ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি তার বিয়ে হয়েছে। সে জানায়, বিয়েতে তার সম্মতি ছিল না। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পারিবারিক সিদ্ধান্তের কারণে তাকে বিয়ে করতে হয়েছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
ওই শিক্ষার্থী বলে, “আমি পড়তে চাই। বাল্যবিয়ের ক্ষতির কথা জানি। কিন্তু আমাদের এলাকায় অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াটাই যেন নিয়ম।”
তার পরিবারের সদস্যরা জানান, সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মেয়েটির মা বলেন, “বয়স বাড়লে মানুষ নানা কথা বলে। তাই বাধ্য হয়েই বিয়ে দিতে হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত। নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে মেয়েদের দূরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে অনেক পরিবার অনিরাপদ মনে করে। ফলে অনেকেই অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেন।
তিনি আরও বলেন, কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের চাহিদা বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে যৌতুকেরও প্রচলন রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি একই এলাকায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীর চতুর্থবার বিয়ে হয়েছে। এর আগে তিনবার বাল্যবিয়ের পর তার সংসার টেকেনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চরাঞ্চলে বাল্যবিয়ে রোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, শিক্ষা সম্প্রসারণ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ একযোগে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবেই এ ধরনের সামাজিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হবে।

