এম এ নকিব নাছরুল্লাহ্ :
ঝুঁকিপূর্ণ জীবন, অনিশ্চিত রুটি-রুজি: তৃণমূলের সাংবাদিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠিন বাস্তব,
দেশের ভিতরের চোখ বাংলাদেশ মানে শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়।
বাংলাদেশ লুকিয়ে আছে হাজারো গ্রাম, মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আর এই সব অঞ্চলের স্পন্দন, হাসি-কান্না, সাফল্য-ব্যর্থতার গল্প যাঁরা প্রথম শোনান, তাঁরা হলেন মফস্বলের সাংবাদিকেরা। তাঁরাই তৃণমূলের প্রতিচ্ছবি, অথচ নিজেদের জীবনটাই থেকে যায় আলো-আঁধারের সীমারেখায়। তাঁরা সমাজের দর্পণ হলেও, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনটি প্রায়শই থাকে ‘উপেক্ষিত’।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার কঠিন পথ মফস্বল সাংবাদিকদের জীবন সংগ্রামের প্রধান দিকগুলো অত্যন্ত কঠিন,
অনিশ্চিত পারিশ্রমিক ও সম্মানীর অভাব,বেশিরভাগ সাংবাদিককে নামমাত্র সম্মানী অথবা মাসের পর মাস কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে খবর প্রকাশের জন্য ব্যক্তিগতভাবে পকেট থেকে অর্থ খরচ করতে হয়। ফলে সাংবাদিকতা তাঁদের কাছে এখন ‘পেশা’-এর চেয়ে ‘নেশা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক নেতা বা দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁরা সরাসরি হুমকির মুখে পড়েন। জীবনহানির ঝুঁকি নিয়ে কাজ করাটা তাঁদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাব তাঁদের কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। একটি জরুরি খবর দ্রুত কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য তাঁদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বা বহু পথ পাড়ি দিতে হয়।
দুঃখের উপাখ্যান, পরিবারের সদস্যরা প্রায়শই অভিযোগ করেন—দিনের পর দিন মাঠে থাকার কারণে সাংবাদিকরা পরিবারকে সময় দিতে পারেন না। সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, যা তাঁদের মানসিক চাপ বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
তবু কেন এই নিরলস পথচলা, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও মফস্বল সাংবাদিকেরা পিছু হটেন না। কারণ তাঁদের কাছে এটি কেবল জীবিকা নয়, এটি জনস্বার্থের প্রতি এক অবিচল অঙ্গীকার। তাঁদের একটি প্রতিবেদন হয়তো একটি স্কুলের দুর্নীতি উন্মোচন করে, একটি নদীর পাড় ভাঙা রোধে প্রশাসনকে তৎপর করে, অথবা একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সমাজকে বাধ্য করে।
এক মফস্বল সাংবাদিকের মন্তব্য, টাকার অভাব আছে, শান্তির অভাব আছে, কিন্তু যখন দেখি আমার খবরের কারণে একটি শিশু সুবিচার পেলো, তখন মনে হয়—সাংবাদিকতার চেয়ে পবিত্র কাজ আর নেই।
প্রত্যাশা,সম্মান ও স্বীকৃতি এই কলমযোদ্ধাদের জন্য আজ প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। তাঁদের কাজের জন্য ন্যায়সঙ্গত ও নিয়মিত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁদের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা নির্ভয়ে খবর পরিবেশন করতে পারেন।
প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে তাঁদের পেশাগত মান উন্নয়নের সুযোগ করে দেওয়া।
মফস্বলের এই সাংবাদিকেরা আমাদের সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁদের দুঃখ-কষ্টকে সম্মান জানিয়ে, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, তাঁরা ভালো থাকলে, আমাদের দেশের তৃণমূলের চিত্র আরও স্পষ্ট ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

