ইফায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রথম শ্রেনীর ৪৭ কর্মকর্তার নিয়োগ অবৈধ

0
495
ইসলামিক ফাউন্ডেশন / প্রতীকি - ছবি

মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান :

ইসলাম প্রচার ও প্রসারে দায়ীত্বে থাকা বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা) অনিয়ম-দূর্নীতি-অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত। ফ্যসিষ্ট হাসিনার আস্থাভাজন সামিম মোহাম্মদ আফজাল মহাপরিচালক পদে দায়ীত্ব পালনকালে এই প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকাশনা, গবেষণা, প্রকল্প সমূহের অর্থ লুটপাট থেকে শুরু করে এমন কোন অপর্কম নেই যা এখানে সংঘটিত হয়নি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপর করা সিএজির অডিট রিপোর্ট, বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন, ইফার বার্ষিক প্রতিবেদন ও বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসন্ধানে এবং সংশ্লিষ্ট অনেকের স্বাক্ষাৎকারে এ চিত্র উঠে এসেছে ।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

ইসলামী গবেষণা, প্রকাশনা,শিক্ষা,সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রচার-প্রসার ও জনসেবার নির্ভরযোগ্য এই প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের নীল নকশা বাস্তবায়ন করতে ২০০৯ সালে শেখ পরিবারের বিশ্বস্ত সামিম মোহাম্মদ আফজালকে মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। হিন্দুত্ববাদী বিদেশী একটি গোয়েন্দা সংস্থার বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতিতে অনৈক্য সৃস্টি বিষয়ক এজেন্ট মেসবাহুর রহমান চৌধূরী , গোলাম মাওলা নকশেবন্দী, সিরাজ উদ্দিন, মোকতাদির চৌধুরীসহ বোর্ড অব গভর্নরদের নীল নকশায় এ প্রতিষ্ঠানটির সুদীর্ঘ ঐতিহ্য নষ্ট করে দয়ো হয় বলে একাধিক সূত্র জানায় । সূত্রগুলো জানায়,২০০৯ সাল পরবর্তী বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান নাটক, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামীর উপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ, ইসলামী রাজনীতির উপর স্টীমরোলার, দেশ ব্যাপী আলেম ওলামাদের উপর নির্দয় বর্বরতা এসব কিছুই ছিল চরম ইসলাম বিদ্বেষী সামিম মোহাম্মদ আফজালসহ ইফার বোর্ড অব গভর্নরদের পরিকল্পনা। অনেকে মন্তব্য করে বলেছেন ,এই সময়ে মর্যাদা সম্পন্ন রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক দারুন নদওয়ায় পরিনত করেন সামিম মোহাম্মদ আফজাল। এই দারুন নদওয়ায় নব্য আবু জাহেলের ভূমিকায় ছিলেন সামিম মোহাম্মদ আফজাল । আর মুগিরা, ওৎবা, শায়বার ভূমিকায় ছিলেন মেসবাহুর রহমান চৌধূরী, গোলাম মাওলা নকশেবন্দী, সিরাজ উদ্দিন, মোকতাদির চৌধুরীসহ ইফার গভর্নিং কমিটির সদস্যরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট অনেকে জানান ,২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফাসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত ফ্যাসিষ্ট হাসিনা ক্ষমতারোহনের পর যেমন বাংলাদেশের সার্বভৌত্ত্বের মালিক বনে যান, তেমনি শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠতা সূত্রে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে শামিম মোহাম্মদ আফজালও নিজেকে মনে করতেন সরকারী এই প্রতিষ্ঠানের তিনিই সর্বেসর্বা । প্রায় একযুগ দায়ীত্ব পালনকালে ইফার কর্মকান্ড পরিচালনে প্রাতিষ্ঠানিক আইন-কানুনের কোন তোয়াক্কা করেননি । বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেলের অধিনস্থ শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর উপর ২০২২ সালে ২০০৯-২০১০ হতে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছর পর্যন্ত অডিট প্রতিবেদনের ২৯ টি অনুচ্ছেদে সামিম মোহাম্মদ আফজালের দায়ীত্ব পালনকালীণ সময়ের অনিয়ম-দূর্ণীতির খন্ড চিত্র প্রকাশ পেয়েছে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

বর্ষা বিপ্লবে ফাসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর সরকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ইফায়ও দূর্ণীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ একটি গণদাবী ছিলো। ২০২২ সালে ২০০৯-২০১০ থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)’র অডিট প্রতিবেদনে উত্থাপিত অমিমাংসিত অনুচ্ছেদ সমূহের সূত্র ও গণচাহিদার প্রেক্ষিতে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয় ২০০৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত ইফার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সে আলোকে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংস্থা-১ শাখার স্মারক নম্বর: ১৬.০০.০০০০.০০৪, ৯৯.০০২.২৪.১২৮; তারিখ: ১৪ মে ২০২৫ খ্রি.,ও স্মারক নম্বর: ১৬.০০.০০০০.০০৪. ৯৯.০০২.২৪.১৫১; তারিখ: ১৪ জুলাই ২০২৫ খ্রি. তারিখের জারিকৃত প্রজ্ঞাপন এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরস এর ৭৫৩/২০২৫/২২৯ নং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেনকে আহ্বায়ক করে, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও অনুদান) মোঃ ফজলুর রহমান, ইফার গভর্নর ড.খলিলুর রহমান মাদানী সদস্য, মাওলানা মাহফুজুল হককে সদস্য, ইফার সচিবকে, সদস্য সচিব করে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের নিয়োগ-পদোন্নতিসহ সংঘটিত অনিয়ম-দূর্ণীতির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে এই ৫৪ পৃষ্ঠার এই তদন্ত প্রতিবেদনে ওই সময়ের নিয়োগ সক্রান্ত অনিয়মগুলোকে সর্বাপেক্ষা বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়। ২০১২ সালে ইফায় প্রথম শ্রেনীর ১২ টি পদে ৪৭ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। প্রথম শ্রেনীর এই ৪৭ জন কর্মকর্তার নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে এই তদন্ত কমিটি সিদ্ধান্ত পেশ করে। তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে “জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখার স্মারক নং০৫.১৭০.০২২.০০.০৫০.২০১০-১৩৮ তারিখ: ৩১.০৩.২০১১ খ্রি. এর পরিপত্র ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ২৪.০৬.২০০৯ তারিখের ১৭০ তম বোর্ডের ৩২/২০০৯ নম্বর সিদ্ধান্ত এবং নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মোঃ রেজাউল করিম কর্তৃক প্রদত্ত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে, উল্লেখিত ৪৭ (সাতচল্লিশ) জন কর্মকর্তার নিয়োগ সন্দেহাতীতভাবে অবৈধ, জালিয়াতিপূর্ণ এবং আইন কর্তৃত্ব বহির্ভূত হয়েছে মর্মে রেকর্ড দৃষ্টে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলো। কাজেই, তাঁদের নিয়োগ বাতিলযোগ্য”।

২০১২ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রাজস্ব খাতে প্রথম শ্রেণির ১২টি পদে নিয়োগকৃত ৪৭ কর্মকর্তা হলেন,সহকারী পরিচালক,শাহাবুদ্দিন,মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ,মীর মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহ , মোস্তাফিজুর রহমান,মোহাম্মদ রেজাউল করিম ,আসমা আক্তার,মশিউর রহমান ভূঁইয়া,মোঃ আলম হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক রনি,ফাহাদ আহমেদ, মোহাম্মদ সুজন আহমেদ চৌধুরী, এ.কে.এম. জাকিউজ্জামান , আবু উবায়দা মোহা. মাসউদুল হক ,মোঃ সাইফুল ইসলাম, আল ফারুক ,মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান (সিরাজগঞ্জ),মোহাম্মদ রাজিউর রহমান, মোঃ হিরণ ব্যাপারী ,তাহামিনা ইয়াছমিন,জান্নাতুল ফেরদৌস ,ফাহমিদা বেগম, মোঃ মারুফ রায়হান, মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন ,আয়েশা আক্তার, সাখাওয়াত হোসেন ,মোঃ মহিউদ্দিন ,মোহাম্মদ ফারুক আহমেদ,সৈয়দ সাবিহা ইহাসলাম ,মোঃ মশিউর রহমান ,মোহাম্মদ জাকির হোসাইন, আশিকুর রহমান
প্রোগ্রাম অফিসার পদে মোঃ আতিয়ার রহমান,রিয়াজুল জান্নাত ,প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে সাহিনা আক্তার ,গবেষণা কর্মকর্তা পদে সাদিয়া শারমিন,পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে মোসা. হুমাইরা আক্তার ,স্টোর অফিসার পদে মোহাম্মদ জামাল হোসাইন,সহকারী গণসংযোগ কর্মকর্তা পদে শায়লা শারমিন,গণসংযোগ কর্মকর্তা পদে বিল্লাল বিল কাশেম, প্রোডাকশন ম্যানেজার (প্রেস) পদে মোঃ শাহ আলম, সমাজবিজ্ঞান প্রশিক্ষক (কৃষি) পদে মোঃ মশিউর রহমান, স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক (মেডিকেল অফিসার) পদে এম এন আল মেহেদী, মেডিকেল অফিসার পদে ডা. এস এম মাহফুজুর রহমান, মুহাম্মদ আনিসুর রহমান,মোঃ মাসুদুজ্জামান, দিলরুবা আফরোজ ,ডা. তানিয়া সুলতানা।

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষনে বলা হয়েছে ,জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখার স্মারক নং ০৫.১৭০.০২২.০০.০৫০.২০১০-১৩৮ তারিখ: ৩১.০৩.২০১১ এর পরিপত্র (সংলাগ-৩১) এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ২৪.০৬.২০০৯ তারিখের ১৭০ তম বোর্ডের ৩২/২০০৯ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫.০৩.২০১২ তারিখে অনুষ্ঠিত পদোন্নতি ও নিয়োগের জন্য বাছাই কমিটির সভায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির উপস্থিতি বিধি সম্মতভাবে আবশ্যক থাকা সত্ত্বেও, উক্ত সভায় সংশ্লিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। নিয়োগ কমিটিতে উপস্থিত থেকেও সদস্য সচিব কার্য বিবরণীতে স্বাক্ষর করেননি। ১৫.৩.২০১২ খ্রি. তারিখের অনুষ্ঠিত সভার কার্য বিবরণীতে স্বাক্ষর প্রদান না করার বিষয়ে স্মারক নম্বর ১৬.০১.০০০০.০০১.২৩.০২০.২৫- ৮৬৮ তারিখ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পত্রের মাধ্যমে নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব জনাব মোঃ রেজাউল করিমের কাছে লিখিত বক্তব্য চাওয়া হয়। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “ ২০১২ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রাজস্বখাতভুক্ত প্রথম শ্রেণীর বিভিন্ন পদে নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যবিবরণীতে অংশগ্রহণকারী সদস্য সচিব হিসেবে আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, উক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও বিধিবহির্ভূত কার্যকলাপ সংঘটিত হয়েছে। এ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ম্যানিপুলেট করার কাজে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন পরিচালক তাহের হোসেন ও হারুন অর রশীদ, ডিএস জালাল আহমদ, ডিডি (পার্সো) এবিএম শফিকুল ইসলাম ও সেকশন অফিসার আজাদ আলী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তারা তৎকালীন মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের নির্দেশে আত্মীয়স্বজন, পূর্বপরিচিত তথা দলের কর্মীদের নিয়োগ দেয়ার জন্য নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অনৈতিক কাজ ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে ব্যর্থ হওয়া অনেক প্রার্থীকে গোপনে পরীক্ষার খাতায় লিখিয়ে পাশ করানো হয়েছে। এই নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় পেন্সিল দিয়ে নম্বর দেয়া হয়েছে। পরে ইচ্ছেমতো মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বেশি দেয়া হয়েছে। অনেক প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পেলেও অবৈধভাবে মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর দিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্তদের মৌখিক পরীক্ষায় অনেক ভালো করা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানো হয়েছে এবং কম নম্বরপ্রাপ্তদের সর্বোচ্চ নম্বর দেয়া হয়েছে। উক্ত নিয়োগে কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি। বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

রেজাউল করিম তার বক্তব্যে বলেন, সিলেকশন কমিটির সদস্য উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, গোলাম মাওলা নকশেবন্দী, মিছবাহর রহমান চৌধুরী, সিরাজউদ্দিন আহমেদ ও আজিজুর রহমান- এই পাঁচজন ও ডিজি নিজেকে নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে নিয়োগের সুপারিশপত্রে স্বাক্ষর করেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই তাঁদের আত্মীয়, পূর্ব পরিচিত ও রাজনৈতিক সংযুক্ত ব্যক্তিবর্গ। এতে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে আমলে নেয়া হয়নি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের যে সকল পরিচালক নিয়োগের সুপারিশপত্রে স্বাক্ষর করেছেন তাদের অধিকাংশকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। তারা মহাপরিচালক নির্দেশে স্বাক্ষর করেছিলেন মাত্র।
তিনি আরো বলেন, নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে জনপ্রশাসন, অর্থ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের পত্র না দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তৎকালীন মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল আমাকে জানান, তারা এসে ঝামেলা করবে। তাদেরকে মিটিং এর চিঠি দেয়ার দরকার নাই। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। এই নিয়োগের অনিয়ম, জালিয়াতি, অনৈতিকতা, অন্যের অধিকার লংঘন কিভাবে ঘটেছে তা নিজ চোখে দেখেছি। তাই বিবেকের তাড়নায় এই নিয়োগের কার্যবিবরণীতে স্বাক্ষর করিনি।”
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, নিজস্ব পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদানের জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনপ্রশাসন, অর্থ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়োগ কমিটির সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, যা কমিটির সদস্য সচিব জনাব মোঃ রেজাউল করিম এর লিখিত বক্তব্যে উঠে এসেছে। ফলে পদোন্নতি ও নিয়োগের জন্য বাছাই কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির স্বাক্ষর নেই। বিধায়, এ নিয়োগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখার স্মারক নম্বর ০৫.১৭০.০২২.০০.০৫০.২০১০-১৩৮ তারিখ: ৩১.০৩.২০১১ খ্রি. এর পরিপত্র সুস্পষ্টভাবে লংঘিত হয়েছে। সহকারী পরিচালক পদে মোঃ ফারুক আহমেদ, সৈয়দ সাবিহা ইসলাম, মোঃ মশিউর রহমান, মোঃজাকের হোসাইন ও আশেকুর রহমানকে প্যানেল থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে যা বিধিসম্মত হয়নি।
পর্যবেক্ষনে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগযোগ্য মোঃ ইব্রাহীম হোসেন (নওগাঁ) ৫ম স্থান অর্জন করার পরও তার অনুকূলে ডাকযোগে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হয়নি। তিনি এ বিষয়ে অভিযোগ করে বলেন “মৌখিক পরীক্ষায় সফলতার সাথে কৃতকার্য হয়ে নিয়োগের জন্য যোগ্য হই যা কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। সে সময় সচিবের দায়িত্বেছিলেন জনাব মুহাম্মদ তাহের হোসেন। তার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাকে নিয়োগপত্র না দিয়ে তার মনোনীত প্রার্থীকে নিয়োগপত্র দেন। বর্তমানে তারা অদ্যাবধি চাকুরি করছেন। দীর্ঘ ১৩ বছর সহকারী পরিচালক পদ থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছি।” সহকারী পরিচালক পদে মেধা কোটায় নিয়োগযোগ্য মোহাম্মদ আমিনুল হক (রাজবাড়ী) তদন্ত কমিটির নিকট অভিযোগ করেন যে (অভিযোগদ্বয়ের সংলাগ- ৩৫) “আমি লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে নিয়োগযোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হই এবং যোগদান করি। কিন্তু পরবর্তীতে আমাকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং এ বিষয়ে সাধারণ ডায়রি করাও ছিলো ভীতিকর। আমার স্থলে বিধিবহির্ভূতভাবে প্যানেল থেকে তৎকালীন কর্তৃপক্ষের পছন্দের অপর একজন প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এ নিয়োগে অনিয়ম তদন্তের জন্য মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের একজন মাননীয় বিচারপতির নেতৃত্বে কাজ করছে জেনে আমি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আবেদন করছি। পরবর্তীতে আমি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার (৯ম গ্রেড) হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হই। বর্তমানে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছি। তবে আমি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকুরি করে দ্বীনের খেদমত করতে আগ্রহী।” নিয়োগ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না দেয়া এবং চাকুরিতে যোগদার করার পর জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে তাদের স্থলে নিজস্ব পছন্দের প্রার্থীকে প্যানেল থেকে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিধায়, এ নিয়োগ জালিয়াতিপূর্ণ।

তিনি তদন্ত কমিটির নিকট আরও অভিযোগ করেন যে, * ২০১১ সালের ২৬ মে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা কর্মকর্তা পদে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে আমি, মোহাম্মদ আমিনুল হক, পিতা: মোঃ আবদুল আজিজ, গ্রাম: বারলাহরিয়া, ডাকঘর: মাটিপাড়া, থানা ও জেলা: রাজবাড়ী উক্ত পদে নিযোগের জন্য আবেদন করি। পরবর্তীতে লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে আমি কৃতকার্য হই এবং মৌখিক পরীক্ষাতেও অনেক ভালো করি। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় পেন্সিল দিয়ে প্রদত্ত নম্বর পরে কলম দিয়ে পরিবর্তন করে আমাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর প্রদান করা হয় এবং আমার পরিবর্তে তৎকালীন কর্তৃপক্ষের পছন্দের এক প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে তৎকালীন নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব জনাব মোঃ রেজাউল করিমের নিকট জিজ্ঞাসা করলেই বিষয়টির সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।” এ ঘটনা নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মোঃ রেজাউল করিমের বক্তব্যের সত্যতা অনুমোদন করে। বিধায়, এ নিয়োগ অস্বচ্ছ। এ নিয়োগে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকেই সহকারী পরিচালক পদে মোঃ সুজন আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ ফারুক আহমেদ, মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আশেকুর রহমান, সৈয়দ সাবিহা ইসলাম, প্রোগ্রাম অফিসার পদে রিয়াজুল জান্নাত ও উৎপাদন ব্যবস্থাপক পদে মোঃ শাহ আলমসহ মোট ৭ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ যে, নিয়োগ কমিটির সভাপতি জনাব সামীম মোহাম্মদ আফজাল ও অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য জনাব র আ ম মোকতাদির চৌধুরীর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এ নিয়োগে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত আবু অবায়দা মাসউদুল হক, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, মোঃ রাজিউর রহমান, মোঃ মহিউদ্দিন, জান্নাতুল ফেরদৌস, মোঃ হিরণ ব্যাপারী, ফাহমিদা বেগম ও মোহাম্মদ ফারুক আহমেদকে মৌখিক পরীক্ষায় ২৮ নম্বরে ২৮ দেয়া হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় ৬০ নম্বরের মধ্যে তাদের প্রাপ্ত নম্বর যথাক্রমে ৩৩, ৩৩, ৩৫, ৩৪, ৩৪, ৩২, ৩০ ও ৩১। অর্থাৎ মৌখিক পরীক্ষায় তাদেরকে শতভাগ নম্বর প্রদান করা হলেও লিখিত পরীক্ষা তাদের প্রাপ্ত নম্বর ৫০-৫৮%। লিখিত পরীক্ষায় শতভাগ নম্বর প্রদান শুধু অস্বাভাবিক নয় অসম্ভবও বটে। এ ঘটনা নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব জনাব মোঃ রেজাউল করিমের বক্তব্যের সত্যতা অনুমোদন করে। বিধায়, এ নিয়োগ অস্বচ্ছ। চাকুরিপ্রার্থী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সাথে পারস্পরিক যোগসাজসে বিধি লংঘন করে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগ কমিটির সভাপতি জনাব সামীম মোহাম্মদ আফজালের ভাগনি ফাহমিদা বেগমকে সহকারী পরিচালক পদে চাকুরি দেয়ার জন্য নিয়োগ পরীক্ষায় ২৮ এ ২৮ দেয়া হয়েছে। অথচ লিখিত পরীক্ষা তার প্রাপ্ত নম্বর ৬০ এর মধ্যে ৩০। সামীম মোহাম্মদ আফজালের ভাতিজা মোঃ শাহ আলমকে প্রোডাকশন ম্যানেজার পদে চাকুরি দেয়া হয়েছে। জনাব মোঃ শাহ আলম এর দাখিলকৃত অভিজ্ঞতার সনদপত্র গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া প্রোডাকশন ম্যানেজার পদে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত জনাব মোহাম্মদ ইসমাইলকে বাদ দিয়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জনাব র আ ম মোকতাদির চৌধুরীর নিকট আত্মীয় জনাব মোঃ সুজন আহমেদ চৌধুরীকে সহকারী পরিচালক পদে চাকুরি দেয়া হয়েছে। তাকে মৌখিক পরীক্ষায় ২৮ এ ২৭.৬৬ দেয়া হয়েছে। এভাবে যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে নিয়োগ কমিটির সদস্যগণ তাদের ভাতিজা, ভাগিনা ও ভাগ্নেসহ নিকট আত্মীয় স্বজন ও পূর্ব পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ২৬ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় রেজাউল করিমের চেয়ে ৭ নম্বর কম পেয়েছে সাদিয়া শারমিন। রেজাউলের মোট নম্বর ৭১,সাদিয়ার ৬৪.১৩ নম্বর। অথচ নম্বরপত্রে রেজাউল করিমের মোট নম্বর ৭১ এর স্থলে ৬১ দেখিয়ে চাকুরি দেয়া হয়েছে সাদিয়া শারমিন। গবেষণা কর্মকর্তা ও উৎপাদন ব্যবস্থাপক পদে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তকে নিয়োগ বঞ্চিতকরে যথাক্রমে সাদিয়া শারমিন ও মোঃ শাহ আলমকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়োগ বাতিলযোগ্য।
পর্যবেক্ষনে আরো বলা হয়, উৎপাদন ব্যবস্থাপক পদে মোঃ শাহ আলম এর দাখিলকৃত অভিজ্ঞতার সনদ ও গণসংযোগ কর্মকর্তা পদে বিল্লাল বিন কাশেম এর দাখিলকৃত অভিজ্ঞতার সনদপত্র গ্রহণযোগ্য নয়। মৌখিক পরীক্ষায় ২৮ নম্বরের মধ্যে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে ২৭.৬৬, মীর মোঃ নেয়ামত উল্যাকে ২৭.৩৩, মোস্তাফিজুর রহমানকে (নেত্রকোণা) ২৭.৬৬, মোহাম্মদ রিজাউল করিমকে ২৭.৩৩, মশিউর রহমান ভূঁইয়াকে ২৭.৫০, মোঃ আলম হোসেনকে ২৭.৩৩, মোঃ সুজন আহমেদ চৌধুরীকে ২৭.৬৬,আয়েশা আক্তারকে ২৭.৬৬, মোঃ সাইফুল ইসলামকে ২৭.৬৬, আল ফারুককে ২৭.৬৬, মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানকে (সিরাজগঞ্জ) ২৭.৬৬ প্রদান করা হয়েছে। এ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার খাতা, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্র যাচাই বাছাই করার জন্য পাওয়া যায়নি। বারবার চাওয়ার পরও তদন্ত কমিটিকে নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র সরবরাহ করা হয়নি। নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র গায়েব করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) পদে কর্মরত জনাব মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানের নিকট এ নিয়োগের নথিপত্র, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্রসহ অন্যান্য তথ্যাদি বারবার চেয়েও পাওয়া যায়নি। তিনি নিয়োগ কমিটিকে অসহযোগিতা করেছেন ও তথ্য গোপন করেছেন। তার এ ধরনের কাজকে সরকারী কাজে বাধা প্রদান হিসেবে গণ্য করা হলো এবং সরকারী কাজে বাধা প্রদান করায় বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here