স্টাফ রিপোর্টার :
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে যে আস্থাহীনতা ও অনিয়মের চাপে ছিল, তার স্পষ্ট প্রতিফলন এখন খেলাপি ঋণের বিপুল পরিমাণে দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
তিন মাস আগের তুলনায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ বৃদ্ধি ব্যাংক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও অনিয়মের ফলাফল।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের দাবি, অতীত বছরগুলোতে কাগজে-কলমে খেলাপি কম দেখানোর বিভিন্ন নীতি ও ছাড় প্রযোজ্য থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন— “দীর্ঘ সময় ধরে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তথ্য প্রকাশ হওয়ায় বাস্তব চিত্র পরিষ্কার হচ্ছে।”
তার মতে, কঠোর পদক্ষেপ না নিলে খেলাপির হার ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বড় শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়া ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনি ও বেসিক ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বড় জালিয়াতির ঘটনা এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
অতীতের ওঠানামা : ১৯৯৯ সালে খেলাপির হার ছিল ৪১%, সংস্কারের ফলে ২০১১ সালে তা নেমে আসে ৬.১%–এ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহারে আবার দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩০ গুণ।
আইএমএফ–এর পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্য প্রকাশ করছে।
এই পদ্ধতিতে— পুনঃতফসিল হলেই খেলাপি ‘মুক্ত’ দেখানো যায় না। মেয়াদোত্তীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও অনাদায়ী ঋণ আলাদা করে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। ফলে প্রকৃত ঘাটতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে— রাজনৈতিক প্রভাব ও জবাবদিহির ঘাটতি, দুর্বল তদারকি ও নীতিমালা শিথিলতা, পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহার, বড় অঙ্কের জালিয়াতি, কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ ও ডলার সংকট।
অধ্যাপক মইনুল ইসলামের প্রস্তাব: প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন। বড় খেলাপিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম। পুনঃতফসিল নীতিকে কঠোর করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও নজরদারি ক্ষমতা বাড়ানো। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ। ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে— ব্যাংকের তারল্য সংকট বেড়ে যাবে। আমানতকারীদের আস্থা কমবে। বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। সরকারি ব্যাংকগুলোর লোকসান বেড়ে জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে এক পরিবর্তন–সংকটের মুখে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা দুর্বল তদারকি, অনিয়ম ও প্রভাবের কারণে খেলাপি ঋণ এখন অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপই পারে এই খাতকে পুনরায় স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

