রাজারহাটে তিস্তা তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ঝুঁকিতে নদীতীরবর্তী মানুষ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

 

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙন ঠেকাতে চলমান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে শিডিউল না মেনে কাজ, কম ওজনের জিও ব্যাগ ব্যবহার, নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সিমেন্ট প্রয়োগ এবং প্রকল্প এলাকায় সাইনবোর্ড না থাকার মতো অভিযোগ করেছেন নদীতীরবর্তী মানুষ। তাদের আশঙ্কা, নিম্নমানের এই কাজ আগামী বর্ষায় তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে ব্যর্থ হলে নতুন করে ঝুঁকিতে পড়বে হাজারো পরিবার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর জেলার তিস্তার ভাঙনপ্রবণ প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকায় দুই দফায় এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার ডাংরারহাট পাড়ামৌলা, রতি ও গাবুর হেলান মৌজায় ১৬টি প্রকল্পের ১০ কোটি ৪২ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে। বেলাল কনস্ট্রাকশন এবং ইউনাইটেড ব্রাদার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

সরেজমিনে, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ডাংরাহাট ও গাবুরহেলান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার বামতীর সংরক্ষণে প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০০ মিটার এলাকায় কাজ চললেও কোথাও কোনো প্রকল্পের পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড নেই। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে দায়িত্বরতদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা যায়। এ সময় শ্রমিকদের দ্রুত সেচযন্ত্র চালিয়ে জিও ব্যাগের ওপর পানি ছিটাতে দেখা যায়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট শিডিউল অনুযায়ী প্রতিটি স্যান্ড-সিমেন্ট জিও ব্যাগের ওজন ১৭৫ কেজি হওয়ার কথা। রামহরি মৌজায় কয়েকটি বস্তা ওজন করে দেখা যায়, অধিকাংশের ওজন ১৩৬ থেকে ১৪৯ কেজির মধ্যে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত মোটা বালুর পরিবর্তে স্থানীয় নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৬০ কেজি সিমেন্ট ব্যবহারের কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ কেজি সিমেন্ট দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

গাইড ওয়াল থেকে টপ লেভেল পর্যন্ত যেখানে ৯ দশমিক ৫০ মিটার থাকার কথা, সেখানে অনেক স্থানে তা ৯ মিটারেরও কম পাওয়া গেছে। পাশাপাশি স্লোপিংয়েও অতিরিক্ত ল্যাপিং গ্যাপ দেখা গেছে। কোটি টাকার এ প্রকল্পের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বস্তার ওজন তো কম দেওয়া হচ্ছেই, পাশাপাশি সিমেন্টের পরিমাণও কম ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে কাজ হলে আসছে বর্ষায় এই বাঁধ বালির বাঁধের মতো ধসে পড়বে।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আব্দুল হাকিম সবুজের ভাষ্য, ‘এখানে রীতিমতো পুকুর চুরি হচ্ছে। নিম্নমানের বালু-সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার স্লোপিংয়ের দৈর্ঘ্যও কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

স্থানীয়দের দাবি, এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে ইতোমধ্যে প্রায় আট হাজার নিম্নমানের জিও ব্যাগ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. মোঃ আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, ‘এত বড় প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ খুবই উদ্বেগজনক। জনগণের টাকার কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। আমরা কোনো অনিয়ম করতে দেব না।

ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশনের সাইট ম্যানেজার মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রকল্পের শিডিউল মেনেই কাজ করছি। কোথাও ত্রুটি থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে।

অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বেলাল কনস্ট্রাকশনের সাইট ম্যানেজার মোঃ রাশেদুল ইসলাম দুলাল। তবে সন্দেহজনক বস্তাগুলো মেপে দেখাতে রাজি হননি তিনি।

কুড়িগ্রাম জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ডাংরাহাট এলাকায় স্যান্ড-সিমেন্ট জিও ব্যাগ ও স্যান্ডফিল জিও ব্যাগ দিয়ে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিছু অভিযোগ পেয়েছি। বস্তার ওজন কম পাওয়া গেলে পরিবর্তন করে নতুন জিও ব্যাগ বসানো হবে। অন্যান্য অভিযোগের সত্যতা মিললেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here