কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
একসময় যার ঢেউয়ের গর্জনে কেঁপে উঠত জনপদ, সেই প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র আজ যেন ক্লান্ত, নিস্তব্ধ। নদের সেই প্রলয়ংকরী রূপ এখন কেবলই স্মৃতি। নদের বুকজুড়ে এখন দিগন্তজোড়া ধু-ধু বালুচর। যেখানে একসময় রুপালি ইলিশের মেলা বসত, আর মাঝিমাল্লাদের হাঁকডাকে মুখরিত থাকত চারপাশ, সেখানে আজ কেবল বাতাসের শনশনানি আর উড়ন্ত ধুলোবালি। শুকনো মৌসুমের শুরুতেই ব্রহ্মপুত্রের অধিকাংশ ক্যানেল ভরাট হয়ে যাওয়ায় থমকে গেছে চিলমারীর প্রাণস্পন্দন। বিপন্ন পেশা, দিশেহারা মানুষ।
নদের এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চড়া মূল্য দিচ্ছে নদীকেন্দ্রিক জীবিকার মানুষগুলো; যারা বংশপরম্পরায় নৌকা চালিয়ে বা মাছ ধরে সংসার চালাতেন, তারা আজ কর্মহীন। মাঝিপাড়ার ফুলেল মাঝি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘নদীতে চর জেগে উঠেছে, পানি নেই। মাছও নেই। আয় না থাকায় সংসার চালানো এখন দায় হয়ে পড়েছে।’
একই চিত্র মৎস্যজীবী মোঃ রহিম উদ্দিন ও মোঃ ধলু রামের কণ্ঠে। তারা জানান, নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের অভয়াশ্রম নষ্ট হচ্ছে। বড় মাছ তো দূরের কথা, ছোট মাছ ধরতেও এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে জাল-নৌকা বিক্রি করে দিয়েছেন। কেউ ঋণের জালে জর্জরিত, আবার কেউবা পেটের তাগিদে পাড়ি জমাচ্ছেন ইটভাটা বা শহরের শ্রমবাজারে।
নদের বুক শুকিয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন কান্নার রোল, অন্যদিকে চরজুড়ে দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরে কৃষকরা আবাদ করছেন ভুট্টা, মরিচ ও নানা জাতের শাকসবজি। চিলমারী অষ্টমীর চরের কৃষক সবুজ মিয়া জানান, ৫ বিঘা জমিতে তিনি ফসল ফলিয়েছেন। ফলন ভালো হলেও তার মুখে হাসি নেই। কারণ একটাই–পরিবহন সংকট। নৌপথ বন্ধ হওয়ায় মাইলের পর মাইল বালুচর পেরিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে ফসল নিতে হচ্ছে বাজারে, যাতে লাভের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ভাড়ায়।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
চিলমারীর নৌপথগুলো এখন মৃতপ্রায়। নৌ-শ্রমিক মোঃ মঞ্জু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে মালপত্র আর মানুষ পারাপার করেই সুখে ছিলাম। এখন কাজ নেই, পরিবার নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে।’ রমনা নৌকাঘাট মাস্টার মো. সিদ্দিকুল ইসলাম সিদ্দিক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দ্রুত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথ সচল না করলে অদূর ভবিষ্যতে চিলমারীর সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
চিলমারী উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, এই এলাকায় ১৪৫২ জন নিবন্ধিত মৎস্যজীবী রয়েছেন। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ নুরুজ্জামান খান স্বীকার করেন যে, মা ইলিশ সংরক্ষণের সময় ছাড়া বছরের বাকি সময় এই সংকটাপন্ন মানুষদের জন্য বিশেষ কোনো সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনও মেলেনি কোনো কার্যকর সমাধান।
পরিবেশবিদদের বক্তব্য, ব্রহ্মপুত্র কেবল একটি নদ নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু আজকের চিত্র বড়ই করুণ। একদিকে নাব্য হারিয়ে নদের মৃত্যুঘণ্টা বাজছে, অন্যদিকে জীবিকার উৎস হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার। ব্রহ্মপুত্রকে বাঁচাতে এবং এই কর্মহীন মানুষগুলোকে মূলধারায় ফেরাতে এখনই পরিকল্পিত ড্রেজিং ও মানবিক সহায়তা জরুরি। নতুবা ইতিহাসের পাতা থেকে হয়তো হারিয়ে যাবে এককালের এই সমৃদ্ধ বন্দর ও তার সাহসী মানুষগুলো।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

