শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

প্লট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ১,৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, বেস্টওয়ের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের সংবাদ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশকালঃ শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

আবাসন প্রকল্পের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অন্তত ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বেস্টওয়ে ল্যান্ড অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেড এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা, জমি দখল ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) মিলনায়তনে ‘পূর্বাচল বেস্টওয়ে সিটি প্লট ওনার্স সোসাইটি’র ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০০৭ সাল থেকে বেস্টওয়ে গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও তাঁর সহযোগীরা ‘পূর্বাচল বেস্টওয়ে সিটি’ এবং ‘ফেয়ারি ল্যান্ড’ নামে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। দেশের কৃষক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, বিচারক, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, প্রবাসী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং এতিমসহ প্রায় ১০ হাজার পরিবারের কাছ থেকে প্লট বরাদ্দের কথা বলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ছাড়া রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও সুয়ারেজ লাইনসহ অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলে আরও শতাধিক কোটি টাকা আদায় করা হয়। তবে গত ১৮ বছরেও গ্রাহকদের কাউকে প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মো. মঞ্জুর আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল কবির খান, শাহাদাত হোসেন, সাবেক ফুটবলার হেলাল আহমেদ এবং শিরিন আক্তারসহ অন্যরা।

বক্তারা অভিযোগ করেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ প্রকল্পের কাজে ব্যয় না করে কুয়াকাটা, কক্সবাজার, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ভালুকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি কেনা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কিস্তির অর্থ দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও করেন তাঁরা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, জমা দেওয়া অর্থ বা প্লট ফেরত চাইলে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, শারীরিক হামলা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের একজন খন্দকার নাজমুল আলম। তিনি ২০১০ সালে তিন কাঠার একটি প্লটের জন্য আট লাখ টাকা পরিশোধ করলেও জমি বুঝে পাননি বলে অভিযোগ করেন। টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে তিনি হুমকির মুখে পড়েন এবং তাঁর পাঠানো আইনি নোটিশও প্রতিষ্ঠানটি গ্রহণ করেনি বলে দাবি করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বছরের পর বছর প্লট পাওয়ার আশায় অপেক্ষা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থেকে অনেক ভুক্তভোগী বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন।

নিবন্ধন বাতিল ও মামলা থাকার পরও কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বেস্টওয়ে ল্যান্ড অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেডসহ ৩৬টি আবাসন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করেছে। একই সঙ্গে এসব প্রকল্পে লেনদেন না করার জন্য সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

এ ছাড়া মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জমি দখল ও প্রতারণার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।

প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ফসলি জমিতে জোর করে বালু ফেলে দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নামমাত্র মূল্যে বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই তাঁদের উচ্ছেদের অভিযোগও তোলা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত এলাকায় এখনো ঘাস ও জঙ্গল ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো অবকাঠামো নেই। তা সত্ত্বেও রাজধানীর বনানীতে করপোরেট অফিস খুলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলন থেকে সমস্যা সমাধানে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—

১. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও রাজউকের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে পূর্বাচল বেস্টওয়ে সিটির সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি অবিলম্বে জব্দ করা।

২. অভিযুক্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও তাঁর সহযোগীদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি, তাঁদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

৩. অবিলম্বে প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়ন অথবা ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১০ হাজার পরিবারকে সুদে-আসলে সম্পূর্ণ অর্থ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।

৪. ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৫. ভবিষ্যতে আবাসন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যাতে প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য রাজউকের অধীনে কঠোর তদারকি সেল গঠন করা।

সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর আইনি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর