২ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার মল্লিকার স্বপ্ন শিক্ষক হওয়া, দারিদ্র্য জয় করে এইচএসসি (বিএমটি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

উচ্চতা মাত্র ২ ফুট ৯ ইঞ্চি। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও থেমে নেই তার স্বপ্ন। নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে উচ্চ মাধ্যমিক (বিএমটি) প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বামন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মোছা. মল্লিকা খাতুন। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

মল্লিকা ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের বিএমটি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি সাইফুর রহমান সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। শারীরিক গঠন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক ছোট হওয়ায় চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও কখনো পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যাননি।

মল্লিকার বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম পানিমাছকুটি গ্রামে। তিনি দিনমজুর মো. মনির হোসেন ও মোছা. আকলিমা বেগম দম্পতির মেয়ে। তার ছোট বোন মোছা. মেঘলা খাতুনের উচ্চতাও মাত্র ২ ফুট ৫ ইঞ্চি। মেঘলা স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে মল্লিকা ও মেঘলাই সবচেয়ে ছোট।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। দুই ভাইয়ের আলাদা সংসার। প্রায় পাঁচ বছর ধরে অসুস্থ থাকায় বাবা মনির হোসেন আর কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে মা আকলিমা বেগমের কাঁধে।

বাড়ির সামনে একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় এবং দুই মেয়ের প্রতিবন্ধী ভাতার টাকাই পরিবারটির প্রধান অবলম্বন। এই সীমিত আয়ের মধ্যেই দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

পরীক্ষা কেন্দ্রে মল্লিকাকে দেখে অনেকেই তার সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের প্রশংসা করেছেন। স্থানীয়দের মতে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারে না—মল্লিকা তারই বাস্তব উদাহরণ।

প্রতিবেশী আব্দুল মালেক লেচু, মালেক মিয়া ও মমিনুল ইসলাম মমিন বলেন, “অত্যন্ত অভাবের মধ্যেও পরিবারটি দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতার হাত বাড়ালে মল্লিকা ও মেঘলা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।”

মল্লিকা খাতুন বলেন, “বাবা-মায়ের সামান্য আয় দিয়েই আমাদের পড়াশোনা চলছে। অভাব আমাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও আমরা দুই বোন পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে একদিন বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করতে পারি।”

তিনি বলেন, “আমি উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। ভবিষ্যতে সরকারি কলেজের একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখি। পথ কঠিন হলেও আমি হাল ছাড়ব না। আমার স্বপ্ন পূরণে সবার দোয়া ও সহযোগিতা চাই।”

ছোট বোন মেঘলা খাতুনও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সবার সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন।

মল্লিকার মা আকলিমা বেগম বলেন, “আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চলছে। শত কষ্টের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করিনি। সে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৪৬ পেয়েছে। আমি চাই, সে লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াক এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষ হোক।”

ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল ইসলাম রিজু বলেন, “মল্লিকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। সে এসএসসিতে ভালো ফল করে আমাদের কলেজে ভর্তি হয়েছে। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা থাকলে সে আরও ভালো করতে পারত। আমরা বিশ্বাস করি, একদিন সে তার স্বপ্ন পূরণ করবে।”

সাইফুর রহমান সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই তাকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়। মল্লিকা অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তার এই অদম্য প্রত্যয় অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।”

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here