২৩ বছর ধরে ভেঙে পড়ে আছে বেরুবাড়ী বাহেজের ঘাট সেতু, চরম দুর্ভোগে ১৫ গ্রামের মানুষ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ী ইউনিয়নের বাহেজের ঘাট সেতু ২৩ বছর ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অন্তত ১৫ গ্রামের মানুষ। অর্ধেক সেতু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, আর অবশিষ্ট অংশও মাঝ বরাবর ভেঙে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন পারাপার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাগেশ্বরী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার দূরে বেরুবাড়ী ইউনিয়নের পাশ দিয়ে প্রবাহিত বেরুবাড়ীর ছড়ার ওপর ১৯৯৪ সালে এলজিইডির অর্থায়নে বাহেজের ঘাট সেতুটি নির্মাণ করা হয়। সেতুটি দিয়ে মীরের ভিটা, চর বেরুবাড়ী, মাস্টারপাড়া, মণ্ডলপাড়া, সবুজপাড়া, আকন্দপাড়া, হাজীপাড়া, চেয়ারম্যানপাড়া, চর রহমানের কুটি, মাদারগঞ্জ, জালির চর, কাইয়ের চর ও শোলমারীসহ অন্তত ১৫ গ্রামের মানুষ যাতায়াত করতেন।

২০০৩ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্রবল স্রোতে সেতুর পশ্চিমাংশ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘদিন ওই এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। পরে ২০১৩ সালে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মোত্তালেব ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভাঙা অংশে একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। সেই সাঁকোই এখন এলাকাবাসীর একমাত্র ভরসা।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কাঠের সাঁকোটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। পচে গেছে পাটাতনের কাঠ, হেলে পড়েছে পিলার। সামান্য অসাবধানতাতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া সেতুর অবশিষ্ট অংশের মাঝ বরাবর ঢালাই ভেঙে নিচে দেবে গেছে। বাঁশ ধরে খাড়া অংশ বেয়ে উঠতে-নামতে হয়। বর্ষাকালে পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় অনেক সময় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় পারাপার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি প্রয়োজনে রোগী নিয়ে যাতায়াত, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন চলাচলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে অনেকেই কলাগাছের ভেলা ব্যবহার করেন, আবার শুষ্ক মৌসুমে হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাচল করতে বাধ্য হন।

চর বেরুবাড়ীর বাসিন্দা আব্দুল আলীম, মোহাম্মদ আলী, আয়নাল হক, মনছুর আলী ও হোসেন আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। একটি সেতুর জন্য বহুবার আবেদন করেও কোনো ফল পাইনি।”

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

মীরের ভিটার বাসিন্দা আব্দুস শাফি বলেন, “ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারে না। বয়স্ক মানুষ সেতুর সামনে এসে আতঙ্কে বসে থাকেন।”

মণ্ডলপাড়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, “রাতের বেলা কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।”

বেরুবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সোলায়মান আলী জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে।

নাগেশ্বরী উপজেলা প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “বর্ষা মৌসুম শেষ হলে বিষয়টি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম খোদাদাদ হোসেন জানান, “আমি অল্প সময় নাগেশ্বরীতে দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে অন্যত্র বদলি হয়েছি। তাই সেতুটির বিষয়ে আমার জানা নেই।”

নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. গোলাম রসুল রাজা বলেন, “২৩ বছর ধরে একটি সেতু ভাঙা পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।”

স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর আশ্বাস নয়, দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের মাধ্যমে এই জনদুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান করা হোক। এতে হাজারো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে এবং এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here