ময়মনসিংহ প্রতিনিধি :
“তামাকমুক্ত তরুণ প্রজন্ম, সুস্থ বাংলাদেশের অঙ্গীকার” – এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ময়মনসিংহ জেলায় যথাযথ মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস-২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সকাল থেকে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়।
সচেতনতার ঢেউ তোলে র্যালি আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে সচেতনতামূলক র্যালিটি শুরু হয়। র্যালির নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসক জনাব মো. সাইফুর রহমান।
র্যালিটি শহরের ব্যস্ততম এলাকা গাঙ্গিনারপাড়, সি.কে. ঘোষ রোড, টাউন হল মোড়, নতুন বাজার প্রদক্ষিণ করে আবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে শেষ হয়।র্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা “ধূমপান ছাড়ুন, জীবন বাঁচান”, “তামাক নয়, সুস্বাস্থ্য চাই”, “তামাকমুক্ত স্কুল চাই, সুস্থ প্রজন্ম চাই” লেখা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে পথচারী, দোকানি ও যানবাহনের চালকদের তামাকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করেন। মাইকে তামাকবিরোধী গান ও স্লোগান বাজানো হয়।র্যালিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সিভিল সার্জন ডা. [নাম] এর নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বেসরকারি সংস্থা নাটাব ও উশিকা সমাজকল্যাণ সংস্থার প্রতিনিধি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক, জেলা তথ্য অফিসের কর্মকর্তা। এছাড়া ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, আনন্দ মোহন কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক শ মানুষ অংশ নেন।আলোচনা সভায় উঠে এলো তামাকের ভয়াবহ চিত্র*
র্যালি শেষে বেলা ১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসক জনাব মো. সাইফুর রহমান।সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে সিভিল সার্জন ডা. [নাম] বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশে তামাকজনিত কারণে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ২৬ হাজার মানুষ মারা যায় পরোক্ষ ধূমপানের কারণে। তামাক শুধু ফুসফুস ক্যানসার নয়, মুখ, গলা, খাদ্যনালী, কিডনি, মূত্রথলি ও হৃদরোগের জন্যও সমানভাবে দায়ী। একটি পরিবার ধ্বংস করতে তামাকই যথেষ্ট।” তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রকাশ্যে ধূমপানের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।নাটাবের বিভাগীয় সমন্বয়কারী জনাব [নাম] বলেন, “তামাক কোম্পানিগুলো এখন তরুণদের টার্গেট করছে। ই-সিগারেট, হুক্কা, স্নাস, নিকোটিন পাউচ – এগুলোকে ‘স্টাইল’ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে। অথচ এগুলো সিগারেটের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। তাই স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। অভিভাবক ও শিক্ষকদের সজাগ থাকতে হবে।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক জনাব [নাম] তামাকের সাথে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকের যোগসূত্র তুলে ধরে বলেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০% মাদকাসক্ত ব্যক্তি তামাক দিয়ে নেশা শুরু করে। তাই তামাককে ‘গেটওয়ে ড্রাগ’ বলা হয়। তামাক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মাদকও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমরা সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করছি।উশিকা সমাজকল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আমরা গ্রাম পর্যায়ে নারীদের নিয়ে ‘তামাকবিরোধী মা সমাবেশ’ করছি। কারণ মায়েরাই পারেন পরিবারকে তামাকমুক্ত রাখতে। একটি তামাকমুক্ত বাড়ি মানেই সুস্থ প্রজন্ম।”
জেলা প্রশাসকের কঠোর বার্তা সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, “একটি সুস্থ, নিরাপদ ও তামাকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে শুধু সরকার একা পারবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদের ইমাম, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠন – সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তরুণদের তামাকের নেশা থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। আমরা জেলার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালকে ১০% তামাকমুক্ত ঘোষণার উদ্যোগ নিচ্ছি। আগামী ৬ মাসের মধ্যে ময়মনসিংহকে মডেল তামাকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যারা প্রকাশ্যে ধূমপান করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শপথ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আলোচনা শেষে সকল অংশগ্রহণকারী তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শপথ বাক্য পাঠ করেন। শপথে তারা নিজ অবস্থান থেকে তামাকবিরোধী প্রচারণা চালানো, পরিবার ও সমাজকে তামাকমুক্ত রাখা এবং তরুণদের নেশা থেকে দূরে রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আয়োজকরা মনে করেন, এই ধরনের কর্মসূচি জেলার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কিশোর-তরুণদের মাঝে তামাকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষা করতে এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে
এই বাংলা/এমএস
টপিক

