মাদ্রাসার অনুদানে জালিয়াতি: স্বাক্ষর জাল করে লাখো টাকা আত্মসাৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক :

 

একদিকে ঢাকায় মাদ্রাসা বোর্ডের চাকরি ও অন্যদিকে বরগুনার বামনা উপজেলার ‘বামনা মহিলা দাখিল মাদ্রাসা’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান। দুইশো কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব থাকা দুইটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করছেন তিনি। জানা গেছে, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে মাদ্রাসা কমিটির সভাপতির পদ আঁকড়ে ধরে আছেন।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ‘বামনা মহিলা দাখিল মাদ্রাসা’র সরকারি অনুদান লুটপাটের চিত্র। যেখানে ১৫ জন শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং শিক্ষকদের চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ২০২৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের (পিবিজিএসআই) আওতায় প্রাপ্ত অনুদান আত্মসাতের একাধিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে মাদ্রাসাটির সুপার ও সভাপতির বিরুদ্ধে।

শুধু প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট নয়, মাদ্রাসার দুটি টিনের ঘর, মাটি, বালু ও ইট নিজ ক্ষমতায় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪ লক্ষ টাকা। এছাড়াও বিভিন্ন খাত দেখিয়ে মাদ্রাসা সুপারের সহযোগিতায় লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

২০২৩ সালে পিবিজিএসআই-এর আওতায় মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধী, বইপত্র-লাইব্রেরি ও শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগার সংস্কারের নামে সরকার পাঁচ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করে। এই অর্থ ব্যয়ের জন্য তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়।

তহবিলে উল্লেখিত শিক্ষার্থীদের নাম, শ্রেণি ও রোল নম্বরের তালিকা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, তালিকায় শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর থাকলেও তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

তালিকায় থাকা ওই সময়ের মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছনিয়া আক্তার, মোসাঃ তন্নী, তামান্না আক্তার, নার্গিস আক্তার ও মোসাঃ খাদিজা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এখন পর্যন্ত তারা কোনো টাকা পাননি এবং কোথাও স্বাক্ষরও দেননি।

এখন প্রশ্ন উঠছে, অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত ৫০ হাজার টাকা—মোট ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা কোথায় গেল?

এ বিষয়ে মাদ্রাসার সুপার মোঃ আলমগীর হোসেন জানান, সাব-কমিটি করা হয়েছিল তিন সদস্যের, তারা বিষয়টি বলতে পারবেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত অবগত নন।

তিনি টাকা উত্তোলন করে তহবিলে দিয়েছেন এবং প্রধান হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন। তবে টাকা বিতরণের সময় তিনি মাদ্রাসায় থাকলেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।

সাব-কমিটির সদস্য মোঃ আজিজুর রহমান (গণিত), ফিরোজা বেগম (সামাজিক বিজ্ঞান) ও মোঃ সাইদুর রহমান (অফিস সহকারী) জানান, তারা জানতেন না যে তারা কোনো আয়-ব্যয় কমিটির সদস্য হয়েছেন। সুপার কোনো মতামত না নিয়ে সাব-কমিটি গঠন করেন।

তারা আরও জানান, সভাপতির মেজো ভাই, তৎকালীন বামনা থানার আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী মোঃ ইউসুফ আলী হাওলাদার এবং মাদ্রাসা সুপার তাদের ওপর ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করেন, এমনকি চাকরি চলে যাওয়ার হুমকিও দেন। একপর্যায়ে তারা বাধ্য হয়ে রেজুলেশনে স্বাক্ষর করেন।

মাদ্রাসার সুপার মোঃ আলমগীর হোসেন স্বীকার করেন, “হাত-পা বাঁধা ছিল, আমি কাঠের পুতুলের মতো ছিলাম; যা সভাপতি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, তাই করেছি।”

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

তথ্য অনুযায়ী, ৩০/১১/২০২৩ তারিখে সভাপতি ও সুপারের যৌথ স্বাক্ষরে মাদ্রাসার তহবিল থেকে ৫,০০,০০০ টাকা উত্তোলন করা হয়।

০২/১২/২০২৩ তারিখে ওই অর্থ থেকে ১,৬৯,৮২০ টাকা মাদ্রাসার সাধারণ তহবিলের হিসাব (পূবালী ব্যাংক, বামনা শাখা)-এ জমা দেওয়া হয়।

০৩/১২/২০২৩ তারিখে সভাপতির নির্দেশে ১,০০,০০০ টাকা সুপার মোঃ নজরুল ইসলাম-এর কাছে দেওয়া হয়।

০৪/১২/২০২৩ তারিখে সভাপতির ব্যক্তিগত হিসাব (সোনালী ব্যাংক, ঢাকা)-এ ৭৫,০৫৮ টাকা জমা হয়।

১০/১২/২০২৩ তারিখে সুপার কাজের তদবীর বাবদ ২০,০০০ টাকা গ্রহণ করেন এবং একই দিনে সভাপতির বড় ভাই হাজী ইউসুফ আলী হাওলাদারকে ১,২০,০০০ টাকার একটি চেক প্রদান করা হয়।

২৬/১২/২০২৩ তারিখে আবারও ১৮,০০০ টাকা উত্তোলন করা হয়।

 

এদিকে, পুরো ঘটনাটিকে তথ্যগত ভুল বলে দাবি করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বিষয়টি বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্তাধীন এবং তিনি কোনো টাকা আত্মসাৎ করেননি।

বরগুনা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ আতিকুল ইসলাম এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here