ভোলায় ভয়াল ১২ নভেম্বর: অর্ধশতাব্দী পরও ঝুঁকিতে উপকূলবাসী

0
397
ছবি - সংগৃহীত

ভোলা প্রতিনিধি :


আজ ১২ নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াল দিনের একটি। ১৯৭০ সালের এই দিনে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তছনছ হয়ে গিয়েছিল দেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলা। মুহূর্তেই হারিয়ে গিয়েছিল প্রায় দেড় লক্ষাধিক প্রাণ, নিখোঁজ হয়েছিল আরও সহস্রাধিক মানুষ। পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও আজও স্বজনহারাদের চোখে সেই দিনের আতঙ্ক ও অশ্রু মুছে যায়নি।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

ভোলার বহু দুর্গম চরাঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় হাজারো মানুষ আজও প্রকৃতির নির্মমতার মুখে অসহায়। চর কাচিয়া মাঝের, চর মদনপুর, চর মোজাম্মেল, চরনিজাম, ঢালচর ও কুকরি-মুকরিসহ অন্তত ৫০টিরও বেশি চরে ঘূর্ণিঝড়ের সময় মানুষজন নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে চরম ঝুঁকিতে থাকে।

চর মদনপুরের বাসিন্দা সালমা বেগম বলেন, “প্রতি বছর ঝড়ের সময় আমরা মৃত্যুভয় নিয়ে থাকি। আশ্রয়কেন্দ্র দূরে, নৌকা চালানোর মতো সময়ও থাকে না। কিছু হলে বাঁচার উপায় নেই।”

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১৯৭০ সালের সেই দিনটিতে সকাল থেকেই ছিল ঝড়ো হাওয়া ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। সন্ধ্যার পর মুহূর্তেই ঝড় রূপ নেয় মহাপ্রলয়ে। তিন দিক নদী আর এক দিক সাগরবেষ্টিত ভোলায় তখন ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। পুরো জেলা পরিণত হয় মৃত্যুপল্লীতে।

ভোলার তুলাতুলির ৭০ বছরের বৃদ্ধ শাহে আলম বলেন, “দিন মা, স্ত্রী আর আমি—তিনজন মিলে ছিলাম। ঝড় উঠতেই সবাই আলাদা হয়ে গেলাম। আমি গাছের ডালে ঝুলে বাঁচি, স্ত্রী অন্য গাছে। কিন্তু আমার মা… এখনো তাকে খুঁজে পাইনি।”

তৎকালীন পূর্বদেশ পত্রিকার সাংবাদিক এম. হাবিবুর রহমান ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সেই বিভীষিকার খবর সারা দেশে পৌঁছে দেন। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সংবাদ পৌঁছাতে সময় লাগে চার দিন। পরে তাঁর লেখা “বাংলার মানুষ কাঁদো—ভোলার গাছে গাছে এখনো ঝুলছে অগণিত লাশ” শিরোনামের প্রতিবেদন দেশ-বিদেশে আলোড়ন তোলে।

ভোলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে জেলায় ৮৬৯টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং গবাদিপশুর জন্য ১৪টি কিল্লা রয়েছে, আরও ৭টি নির্মাণাধীন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা অপ্রতুল।

মনপুরা উপজেলার এক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বলেন, “গত বর্ষায় নদীভাঙনে একটি আশ্রয়কেন্দ্র ও ইউনিয়ন পরিষদ বিলীন হয়ে গেছে। অন্তত ৫-৭ হাজার মানুষ এখন আশ্রয়হীন। ঘূর্ণিঝড় হলে কোথায় যাবো জানি না।”

ভোলা জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, “বর্তমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দিয়ে আমরা দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আরও কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।”

আজও ১২ নভেম্বর এলেই ভোলার আকাশ ভারী হয়ে ওঠে স্মৃতিতে, আর উপকূলবাসীর হৃদয়ে জেগে ওঠে সেই প্রশ্ন— “আরেকটা ১৯৭০ কি আবার ফিরে আসবে?”

ভোলার মানুষের জীবন তাই আজও ঝড়ের সঙ্গে লড়াইয়ের নাম— একদিকে হারানো প্রিয়জনের স্মৃতি, অন্যদিকে টিকে থাকার সংগ্রাম।

এই বাংলা/এমএস
টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here