”বীর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান” গ্রন্থ পর্যালোচনা

​শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ওপর রচিত কালাম ফয়েজীর অনবদ্য গ্রন্থ ‘বীর রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান’। লেখক : সাহিত্যিক ও বহু গ্রন্থের প্রণেতা কালাম ফয়েজী।

গ্রন্থের বিষয়বস্তু
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবনদর্শন, চিন্তা চেতনা ও রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞের মূল্যায়ন।

​প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য
যেকোনো জীবনীমূলক বা ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থের একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ও মানদণ্ড থাকে। বহু গ্রন্থের রচয়িতা, গবেষক, কবি ও ঔপন্যাসিক কালাম ফয়েজী সেই প্রেক্ষাপট ও মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিষয়ক গবেষণার একটি শূন্যস্থান পূরণ এবং পাল্টা আখ্যান (Counter-narrative) তৈরির তাগিদ থেকে এই গ্রন্থটি রচনা করেন। তিনি দুই দশক ধরে তিল তিল করে সাজিয়েছেন তাঁর এই তিন খণ্ডের ঐতিহাসিক দলিল। লেখকের মতে, জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ধারাবাহিকভাবে তাঁর চরিত্র হনন ও ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করেছে। সেই অপপ্রচারের জবাব দেওয়া ছিল প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য। অতঃপর যে সকল প্রত্যক্ষদর্শী ও গবেষক ঐতিহাসিক, যাঁরা জিয়াউর রহমানের প্রকৃত অবদান ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানতে ও জানাতে আগ্রহী তাঁদের কাছে একটি বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরাই ছিল এই বইটির আরেক উদ্দেশ্য।

​বিষয়বস্তু ও মূল সুর
বইটির মূল সুর হলো জিয়াউর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা। লেখক কালাম ফয়েজী মনে করেন, জিয়াউর রহমান কোনো রূপকথার নায়ক নন। বরং তিনি একজন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক, বাস্তববাদী, দূরদর্শী এবং মাটি ও মানুষ। লেখক তাঁকে দেশের আপামর জনতার কাছাকাছি থাকা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে চিত্রিত করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, একটি সদ্য স্বাধীন ও সংকটপূর্ণ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও নিজ কর্মগুণে কিভাবে বিশ্বনেতা হয়ে উঠা যায়।
​বইটিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর জনসম্পৃক্ততা, দেশপ্রেম এবং জনগণের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা। জিয়াউর রহমান কীভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষের কাছে গেছেন, তা বিশদভাবে উঠে এসেছে তার এই দালিলিক গ্রন্থে। বিশেষ করে কৃষি, পরিবেশ, সর্বোপরি বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তার জন্য ‘খালকাটা কর্মসূচি’-র মতো উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি জাতিকে কর্মমুখী করেছেন। পাশাপাশি কৃষিবিপ্লব, স্বাস্থ্যবিপ্লব, শিক্ষাবিপ্লব ও শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে পুরো জাতিকে যুগান্তকারী উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।

​ঐতিহাসিক তুলনা
লেখক তাঁর বিষয়বস্তুকে মহিমান্বিত করতে জিয়াউর রহমানকে বিশ্ব ইতিহাসের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব— যেমন কামাল আতাতুর্ক, জর্জ ওয়াশিংটন, রোমান শাসক জুলিয়াস সিজারের মতো মহানায়কদের সমকক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

​বইটির গঠন ও বিন্যাস
বিশাল আকারের বইটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও গবেষণালব্ধ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লেখক এটিকে ‘পাঠ্যবইয়ের মতো’ সাজানোর চেষ্টা করেছেন। বইটিতে জিয়াউর রহমানের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আলাদা আলাদা শিরোনামে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন, ছাত্রজীবন এবং শিশুদের সাথে তার সম্পৃক্ততা,
​মুক্তিযুদ্ধ,​ ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ​বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ​স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি,
​বহুদলীয় রাজনীতির সুনির্দিষ্ট বিন্যাস। এর ফলে সাধারণ পাঠক এবং রাজনৈতিক কর্মীরা খুব সহজেই নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবেন। গ্রন্থের ​সাহিত্যমান ও ভাষা অত্যন্ত সহজ সরল।

যেহেতু লেখক কালাম ফয়েজী নিজে একজন প্রতিষ্ঠিত কবি ও সাহিত্যিক, তাই একটি ইতিহাস ভিত্তিক ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও এর পরতে পরতে তাঁর সাহিত্যিক মুন্সিয়ানার ছাপ স্পষ্ট। সাধারণত ইতিহাস বা রাজনীতির বই অতিরিক্ত তথ্যভারে অনেক সময় নীরস হয়ে পড়ে, কিন্তু এই বইটির ক্ষেত্রে তা হয়নি। লেখকের ঝরঝরে গদ্য, চমৎকার শব্দ চয়ন এবং সাবলীল বর্ণনাভঙ্গি পাঠককে ধরে রাখতে সাহায্য করবে। কঠিন রাজনৈতিক তত্ত্ব ও ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহকে তিনি অত্যন্ত সুখপাঠ্য ও সাহিত্যের মোড়কে উপস্থাপন করেছেন, যা বইটির সাহিত্যমানকে সমৃদ্ধ করেছে।

​পর্যালোচকের মূল্যায়ন ও ইতিবাচক দিক
বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো লেখকের আবেগ এবং সহজ সরল বর্ণনা। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের যে জনমুখী দিকগুলো ছিল, তা অত্যন্ত সাবলীল, জোরালো ও সুখপাঠ্য ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাস ও রাজনীতির শিক্ষার্থীদের জন্য জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে এটি একটি চমৎকার সহায়ক গ্রন্থ হতে পারে।

​প্রতিটি জাতি-রাষ্ট্রেরই একজন আইকন থাকেন, যাঁকে নিয়ে সেই জাতির লোকেরা গর্বের সঙ্গে অনুকরণ ও অনুসরণ করতে পারে। যেমন আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, চীনের মাও সে তুং, জার্মানির বিসমার্ক; তেমনি বাংলাদেশের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান— যাঁর প্রতিটি কর্ম, চিন্তা ও আইডিয়া অনুকরণীয়। লেখক সেভাবেই সাজিয়েছেন গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়। তিনি প্রতিটি লেখা সাজিয়েছেন প্রমাণসহ এবং প্রতিটি প্রাসঙ্গিক আলোচনার সঙ্গে রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন। জিয়াউর রহমানের সাহসী কর্মতৎপরতা আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস এবং তাদের বীরত্বগাথাকে তিনি একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে বাঁধার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ এ গ্রন্থের পাতা উল্টালেই পাঠক সে সময়কার অনেক কঠিন সত্য ও অজানা তথ্যের সমাহার পেয়ে যাবেন।

​সীমাবদ্ধতা:
লেখক কালাম ফয়েজী জনপ্রিয় জননেতা জিয়াউর রহমানের একজন গভীর ও নিষ্ঠাবান অনুরাগী। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বইটিতে নিখাদ ইতিহাস বর্ণনার পাশাপাশি জিয়াউর রহমানের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধামিশ্রিত আবেগ প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে, যা ইতিহাস ও গবেষণার কঠোর মানদণ্ডে একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

​উপসংহার
কালাম ফয়েজীর এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়কে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যারা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর তাত্ত্বিক ভিত্তি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই হতে পারে।
​লেখক যে ২০ বছর ধরে বিরামহীন পরিশ্রম করেছেন, একান্তই নিজের আগ্রহে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন এবং কারো প্রেরণা বা সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে থাকেননি, বইটির যেকোনো অধ্যায় পড়তে গেলেই পাঠক তা অনুভব করতে পারবেন। বইটি দেশের সচেতন নাগরিকসহ বিএনপির প্রতিটি নেতা-কর্মীর অবশ্যপাঠ্য হিসেবে বিবেচনায় আনা উচিত বলে আমি মনে করি।

মোহাম্মদ মোশার্রাফ হোছাইন খান
লেখক, সাংবাদিক ও গ্রন্থ সমালোচক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here