পেশ ইমাম সচিব পদমর্যাদায়: প্রশাসনিক ইতিহাসে অভূতপূর্ব নজির

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা :

 

বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গন ও সরকারি প্রশাসনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সাবেক পেশ ইমাম মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীকে । জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে সরাসরি সচিব পদমর্যাদায় (গ্রেড-১) চুক্তিভিত্তিক এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে । ৬ষ্ঠ গ্রেডের একজন পেশাদার ইমামের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই সর্বোচ্চ স্তরে আসীন হওয়ার ঘটনাটি আলেম সমাজ ও আমলাতন্ত্রে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিলেও, সম্প্রতি আমাদের অনুসন্ধানী দলের হাতে আসা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কিছু অকাট্য দাপ্তরিক নথি এই নিয়োগের পেছনে নথিপত্র প্রস্তুতকরণে এক বড় ধরণের অসঙ্গতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে ।

 

মূল শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তি: ইফার নিজস্ব দাপ্তরিক প্রমাণ

 

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ২০১৫ সালের দুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর দাপ্তরিক চিঠি (স্মারক নম্বর: ইফা:প্রশা/বা.ন-১(২০৬)/৭০/৯৮/১০৪) থেকে জানা যায়, মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীর দাওরায়ে হাদিস পাসের সার্টিফিকেটটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও নথিপত্র প্রস্তুতকরণে অসঙ্গতিপূর্ণ।

 

নথির বিবরণ অনুযায়ী:

 

তদন্তের সূত্রপাত: ১৯৯৭ সালের ৬ জানুয়ারি দৈনিক রূপালী পত্রিকায় “ইমাম নিয়োগে দলীয়করণ ও অসঙ্গতি” শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদের সূত্র ধরে দীর্ঘ ১৮ বছর পর, ২০১৫ সালের ৭ জুলাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল একটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ দেন।

 

সরেজমিন তদন্ত: তদন্ত কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল (পরিচালক, ইসলামিক মিশন) ১২ জুলাই ২০১৫ তারিখে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় (আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম) সশরীরে গিয়ে রেকর্ডপত্র যাচাই করেন।

 

মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সাক্ষ্য: হাটহাজারী মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মাওলানা মোঃ মনসুরুল হক এবং মাওলানা আহসান হাবীব মুফতি বাকীর দাখিলকৃত সার্টিফিকেটের ফটোকপি দেখে স্পষ্টভাবে জানান যে, সনদের সাইজ, বর্ণনা এবং মনোগ্রাম সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভুয়া। তারা আরও জানান, হাটহাজারী মাদ্রাসায় ৩ বছরের মার্কশিট কখনো একসাথে প্রদান করা হয় না, যা মুফতি বাকী অসঙ্গতিপূর্ণ উপায়ে জমা দিয়েছিলেন।

 

তদন্ত কর্মকর্তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা তার চূড়ান্ত রিপোর্টে স্বাক্ষরসহ উল্লেখ করেন—”জনাব মোঃ মুহিববুল্লাহিল বাকীর সনদপত্র জাল।”

 

শিক্ষাজীবনের টাইমলাইনে গাণিতিক শুভঙ্করের ফাঁকি

 

মুফতি বাকীর ”বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকসমূহের কেন্দ্রীয় শরিয়াহ বোর্ড (সিএসবিআইবি)” অফিশিয়াল বায়োডাটায় দেওয়া বিভিন্ন ডিগ্রির সাল এবং অর্জনের ক্রমানুসারে চরম গাণিতিক অসঙ্গতি দেখা যায়, যা তার নথিপত্রের সত্যতাকে আরও জোরালো প্রশ্নের মুখে ফেলে:

 

দাওরা হাদিস ও দাখিল সনদে অসংগতি : বায়োডাটা অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৮ সালে দাখিল (SSC সমমান) পাস করেন এবং ঠিক তার পরের বছরই, অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে ‘কুল্লিয়াত-আল-হাদিস’ (দাওরা হাদীস) সম্পন্ন করেন। দাওরা হাদীস পাশ করতে একজন শিক্ষার্থীর ১৯ থেকে ২২ বছর সময় লাগার কথা। তার জম্ম তারিখ ১৯৭৪ দেখোনো হয়েছে, ১৯৮৮ সালে প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় দাখিল পাস সম্ভব হলেও কোন মতেই ১৯৮৯ সালে দাওরা হাদীস পাশ করা সম্ভব নয়। যা অলৌকিক ও অসম্ভব। তার জম্ম তারিখের সততা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি রহস্য: তিনি ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। বায়োডাটায় ভারতের লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রির পাশে “Appeared” (চলমান) লিখে রাখা হয়েছে। লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৮ বছরের মধ্যে থিসিস জমা না দিলে ছাত্রত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। দীর্ঘ একটি অসমাপ্ত ও তামাদি গবেষণার তকমা ঝুলিয়ে রেখে তিনি ছদ্ম-একাডেমিক ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করেছেন বলেও অনেকে মনে করছেন।

 

অপরাধের ধরন ও প্রাতিষ্ঠানিক অসঙ্গতির গভীর বিশ্লেষণ

 

মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীর কর্মকাণ্ডের সাথে দেশের বৃহৎ আর্থিক অপরাধীদের কর্মকাণ্ডের গভীর সাদৃশ্য এবং কিছু কাঠামোগত বৈসাদৃশ্য রয়েছে:

 

সাদৃশ্য (নথিপত্র প্রস্তুতকরণে অসঙ্গতি ও মুখোশ): বড় আর্থিক অপরাধীরা যেমন ভুয়া কোম্পানি বা জাল এলসি তৈরি করে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎ করে, মুফতি বাকীও ঠিক একইভাবে নিজের কর্মজীবন ও পদোন্নতির ভিত্তি তৈরি করতে দাওরায়ে হাদিসের ভুয়া সার্টিফিকেট এবং কাল্পনিক পিএইচডি টাইমলাইন ব্যবহার করেছেন। বড় লুটেরারা যেমন ভালো ব্যবসা বা করপোরেট সুশাসনের মুখোশ পরত, মুফতি বাকীও তার অসঙ্গতি ঢাকার জন্য জাতীয় মসজিদের ইমামতি ও ধর্মীয় পাণ্ডিত্যের একটি প্রভাবশালী ‘ধর্মীয় আড়াল’ ব্যবহার করেছেন।

 

বৈসাদৃশ্য: প্রথাগত বড় অপরাধীরা যেখানে রাষ্ট্রের টাকা সরাসরি চুরি করে, মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী সেখানে “রাষ্ট্রের বিশ্বাস এবং নৈতিকতার কাঠামোটি” নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করেছেন। তিনি জালিয়াতির সনদ দিয়ে সিভিল সার্ভিসকে বিতর্কিত করেছেন এবং দেশের ব্যাংকিং জালিয়াতির হোতাদের ধর্মীয় বৈধতা দিয়েছেন।

 

৪. প্রধান অসঙ্গতিসমূহের তুলনামূলক সারণি (Table)

 

অসংগতির খাত

 

বায়োডাটার দাবি / প্রচলিত তথ্য

 

দাপ্তরিক নথি ও অনুসন্ধানের বাস্তব চিত্র

 

আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অসংগতি

 

মূল শিক্ষাগত যোগ্যতা

 

কওমি ধারার শীর্ষ বিদ্যাপীঠ হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে ১৯৮৯ সালে ‘দাওরায়ে হাদিস’ পাস।

 

২০১৫ সালের ইফার অভ্যন্তরীণ তদন্তে হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষকরা সনদ ও মার্কশিটকে সম্পূর্ণ জাল (Fake) বলে প্রত্যয়ন করেন।

 

গুরুতর অপরাধ: জাল সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশ দণ্ডবিধির (Penal Code) পরিপন্থী।

 

শিক্ষাজীবনের টাইমলাইন

 

১৯৮৮ সালে দাখিল (SSC সমমান) পাসের মাত্র ১ বছর পর ১৯৮৯ সালে উচ্চতর ‘কুল্লিয়াত-আল-হাদিস’ সম্পন্ন।

 

প্রথাগত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী দাখিল পাসে করতে ১৫ বছর, দাওরায়ে হাদিস বা কুল্লিয়াত স্তরে পৌঁছাতে কমপক্ষে ১৯ থেকে ২২ বছর সময় লাগে।

 

গাণিতিক ও একাডেমিক অসম্ভবতা: মাত্র ১৬ বছরে হাফেজী ও কাওমী ধারার সর্বোচ্চ স্তরের ডিগ্রি অর্জন অসম্ভব।

 

দ্বৈত ভূমিকা (চাকরি ও পড়াশোনা)

 

১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের দারুল মারিফ মাদ্রাসায় পূর্ণকালীন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।

 

এই একই সময়কালে (১৯৯৪ ও ১৯৯৬) তিনি মাদ্রাসা বোর্ডের ফাজিল ও কামিল পাস করেন এবং ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র হিসেবে এমএ শেষ করেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরি বিধির লঙ্ঘন: পূর্ণকালীন লাভজনক চাকরিতে বহাল থেকে একই সময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ডিগ্রি নেওয়ার বিষয়টি অস্পষ্ট।

 

পিএইচডি (Ph.D.) স্ট্যাটাস

 

১৯৯৭ সালে মাস্টার্স পাসের পর থেকে ভারতের লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য “Appeared” বা গবেষণারত।

 

১৯৯৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৯ বছর পার হয়ে গেছে। লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬-৮ বছরের মধ্যে থিসিস জমা না দিলে রেজিস্ট্রেশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।

 

ছদ্ম-একাডেমিক যোগ্যতা: প্রায় তিন দশক ধরে একটি তামাদি ও মেয়াদোত্তীর্ণ গবেষণার তথ্যকে জীবনবৃত্তান্তে জিইয়ে রাখা চরম বিভ্রান্তিকর।

 

চাকুরিকালীন আচরণ বিধি

 

তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ এবং ২০০৩ থেকে বায়তুল মোকাররমের সরকারি পেশ ইমাম (৬ষ্ঠ গ্রেড)।

 

সরকারি চাকুরিতে থাকা অবস্থাতেই তিনি সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া দেশের ১০টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ড এবং ৩টি মাদ্রাসার লাভজনক পদে যুক্ত ছিলেন।

 

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯ এর লঙ্ঘন: বিধি-১৫ এবং বিধি-১৭ অনুযায়ী সরকারের লিখিত অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো লাভজনক পদ বা সম্মানী গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি।

 

আর্থিক খাতের নৈতিক দায়

 

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার একজন শীর্ষ ও নিরপেক্ষ শরিয়াহ অভিভাবক।

 

২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক ইসলামী ব্যাংকগুলো দখলের পর তিনি তাদের অনুগত শরিয়াহ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং বহু ভুয়া ঋণ প্রক্রিয়াকে নীরব থেকে ‘শরিয়াহসম্মত’ সার্টিফিকেট দেন।

 

তদারকি ও পেশাগত ব্যর্থতা: গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড (AAOIFI) অনুযায়ী জاليةতি ও অর্থপাচারে নীরব থাকা বা ‘এক ব্যক্তি একাধিক ব্যাংকের বোর্ডে’ থাকা স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest)।

 

প্রশাসনিক যোগ্যতা ও সিন্ডিকেট

 

তিনি সরকারের ১ম গ্রেডের (সচিব পদমর্যাদা) একজন যোগ্য এবং স্বাধীন মহাপরিচালক (ডিজি)।

 

সরকারের জটিল ফাইলিং, পিপিআর আইন বা অডিট নিষ্পত্তির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তার নেই। ফলে শাস্তিমূলক বদলিকৃত পরিচালক তৌহিদুল আনোয়ার প্রতিষ্ঠানে কার্যত ‘ছায়া ডিজি’ (Shadow DG) হিসেবে ফাইল নিয়ন্ত্রণ করার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

আমলাতান্ত্রিক বিপর্যয়: প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক নিয়ম এবং ২০-২৫ বছরের ফিডার পদের অভিজ্ঞতা ডিঙিয়ে এমন নিয়োগ চেইন অব কমান্ডের পরিপন্থী।

 

 

 

চাকুরিকালীন সময়ে বিধিমালা লঙ্ঘন ও আইনের সাথে সরাসরি সংঘাত

 

মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীর অফিশিয়াল জীবনবৃত্তান্ত এবং চাকুরিকালীন রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরিতে (পেশ ইমাম হিসেবে) প্রবেশের পর থেকে তিনি যুগপৎভাবে দেশের ১০টি শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৩টি মাদ্রাসা এবং বেসরকারি ফাউন্ডেশনের নীতিনির্ধারণী লাভজনক পদে যুক্ত ছিলেন। একজন নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার এই দ্বৈত ভূমিকা ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর একাধিক ধারার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং বেআইনি:

 

বিধি-১৭ (বাণিজ্য ও চাকরি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ) এর সাথে সংঘাত: এই বিধির ১ নম্বর উপ-ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে সরকারি দায়িত্ব ব্যতীত অন্য কোনো ব্যবসা, চাকরি বা কার্য গ্রহণ করতে পারবেন না। মুফতি বাকী ১০টি বেসরকারি ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান বা সদস্য হিসেবে নিয়োজিত থেকে নিয়মিত সিটিং অ্যালাউন্স ও আর্থিক সম্মানী গ্রহণ করেছেন, যা এই বিধির সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন।

 

বিধি-১৫ (কোম্পানি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা) এর সাথে সংঘাত: এই বিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো ব্যাংক বা বাণিজ্যিক কোম্পানির স্থাপন, নিবন্ধীকরণ বা ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। শরিয়াহ বোর্ডের শীর্ষ পদে থেকে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের ব্যাংকগুলোর আর্থিক নীতি নির্ধারণ ও তদারকি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে তিনি এই বিধির চরম লঙ্ঘন করেছেন।

 

স্বার্থের সংঘাত: সরকারি কর্মচারীদের নিয়ম হলো তারা তাদের পুরো কর্মঘণ্টা কেবল রাষ্ট্রের কাজেই উৎসর্গ করবেন। কিন্তু তিনি একই সাথে ঢাকার তিনটি মাদ্রাসায় ‘শায়খুল হাদিস’ হিসেবে ক্লাস নিয়েছেন এবং একটি বেসরকারি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কোনো বিশেষ প্রেষণ বা লিয়েন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন ছাড়া একই সাথে এতগুলো লাভজনক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে তার এই সম্পৃক্ততা সরকারি চাকরির শৃঙ্খলার পরিপন্থী।

 

২০১৭ সালের ব্যাংক দখল ও আর্থিক খাতের নীতিগত দায়

 

মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীর ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের গ্রাফ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭ সালে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ কর্তৃক দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংক জোর পূর্বক দখলের ঘটনার পর থেকেই তিনি রাতারাতি দেশের ইসলামিক ব্যাংকিং খাতের অন্যতম শীর্ষ ‘শরিয়াহ ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘সেন্ট্রাল শরীয়াহ কাউন্সিল ফর ইসলামিক ব্যাংকস’-এর শীর্ষ পদে থাকার পাশাপাশি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ব্যাংকসহ অন্তত ১০টি ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ডের নীতিনির্ধারণী সদস্য বা চেয়ারম্যান হিসেবে যুক্ত হন]। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক কেলেঙ্কারি, ভুয়া ঋণ বিতরণ ও আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়াকে ‘শরিয়াহসম্মত’ সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বোর্ডগুলোর শীর্ষ পদে থাকায় তার পেশাগত, নৈতিক ও তদারকি ব্যর্থতার দায় নিয়ে এখন তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে।

 

বৈশ্বিক শরিয়াহ গভর্ন্যান্স বনাম মুফতি বাকীর অপেশাদারিত্ব

 

গ্লোবাল ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যান্ডার্ডস (যেমন- এএওআইএফআই এবং আইএফএসবি) এবং বিশ্বের শীর্ষ মুসলিম দেশগুলোর শরিয়াহ গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুফতি বাকীর কাজের ধরন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল:

 

‘এক ব্যক্তি, এক ব্যাংক’ নীতির লঙ্ঘন: মালয়েশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংক এবং বাহরাইন-ভিত্তিক এএওআইএফআই এর শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, কোনো শরিয়াহ স্কলার স্বার্থের সংঘাত ও তথ্য পাচার রোধ করার জন্য একই সাথে একই খাতের একাধিক ব্যাংকিং বোর্ডে থাকতে পারেন না। মুফতি বাকী একই সাথে ১০টি ব্যাংকের বোর্ডে থেকে এই নীতি লঙ্ঘন করেছেন।

 

শরিয়াহ অডিট ও ফিটনেস টেস্টে ব্যর্থতা: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, অনিয়ম লুকানো বা নীরব থাকা শরিয়াহ অডিটরের বড় ধরণের পেশাগত অপরাধ। ২০১৭ সালের ব্যাংক দখলের পর যখন অর্থপাচার ও ভুয়া ঋণ বিতরণ হচ্ছিল, তখন মুফতি বাকীর শরিয়াহ বোর্ড কোনো প্রকার অডিট আপত্তি তোলেনি, যা বৈশ্বিক ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ সূচকে তাকে শরিয়াহ বোর্ডের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য ঘোষণা করে।

 

প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন বিপর্যয় ও চেইন অব কমান্ড ধস ও বিশেষজ্ঞদের অবজারবেশন

 

বাংলাদেশের ৫৫ বছরের প্রশাসনিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন বা বিতর্কিত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কিছু নেতিবাচক নজির থাকলেও, সম্পূর্ণ অ-প্রশাসনিক ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন ৬ষ্ঠ গ্রেডের ধর্মীয় কর্মচারীকে রাতারাতি সিভিল সিলেকশন ও প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বোচ্চ স্তর অর্থাৎ ১ম গ্রেডের (সচিব পদমর্যাদায়) একটি মেগা প্রতিষ্ঠানের প্রধান করার ঘটনা এটিই প্রথম এবং সম্পূর্ণ নজিরবিহীন । এই প্রজ্ঞাপনে আমলাতান্ত্রিক চেইন অব কমান্ডে যে ধস নেমেছে তার প্রধান দিকগুলো হলো:

 

সিনিয়রিটির চিরস্থায়ী নীতি ধ্বংস: একজন নিয়মিত কর্মকর্তাকে ৪র্থ গ্রেড থেকে ১ম গ্রেডে পৌঁছাতে দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক চাকরির অভিজ্ঞতা ছাড়াই এমন পদোন্নতি পুরো আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার যৌক্তিকতাকে অর্থহীন করে তোলে।

 

আদেশের বৈধতা ও ফাইল পরিচালনায় সংকট: প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, অভিজ্ঞ আমলারা যখন জটিল ফাইলের আইনি ও আর্থিক মারপ্যাঁচে নোট লিখবেন, তখন নতুন ডিজি অনভিজ্ঞতার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হবেন। ফলে অধস্তন কর্মকর্তাদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং দাপ্তরিক আদেশের কার্যকারিতা ধসে যাবে।

 

‘ছায়া ডিজি’ সিন্ডিকেটের সমান্তরাল শাসন: চেইন অব কমান্ড ভাঙার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—বদলিকৃত একজন নিম্নপদের পরিচালক (তৌহিদুল আনোয়ার) যখন প্রধান কার্যালয়ে এসে বহিরাগত করপোরেট ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারি ফাইল নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন প্রমাণিত হয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে ।

 

দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব

 

এই নজিরবিহীন নিয়োগের ফলে দেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, ধর্মীয় খাত এবং আর্থিক ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার গভীর আশঙ্কা রয়েছে:

 

আমলাতন্ত্রের কর্মস্পৃহা নষ্ট হওয়া: বেসামরিক প্রশাসনের একজন মেধাবী কর্মকর্তা যখন সততা ও দক্ষতার সাথে দীর্ঘ তিন দশক কাজ করার পর দেখবেন কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন ধর্মীয় কর্মকর্তা বিশেষ তদবিরের জোরে সচিবের চেয়ারে বসে যাচ্ছেন, তখন সৎ আমলারা কাজের নৈতিক স্পৃহা হারিয়ে ফেলবেন। এটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কার্যক্ষমতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে।

 

তদবির সংস্কৃতির স্থায়ী রূপ নেওয়া: এই নিয়োগটি ভবিষ্যতে একটি আইনি নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে সরকারের অন্যান্য সংস্থায় কর্মরত জুনিয়র বা কারিগরি কর্মকর্তারাও নিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতির আশা ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক দল, প্রভাবশালী করপোরেট গ্রুপ বা বিশেষ মহলের পেছনে তদবিরের সংস্কৃতি শুরু করবেন।

 

উন্নয়ন প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক অনুদান স্থবির হওয়ার আশঙ্কা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুদানের মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে। অডিট নিষ্পত্তি ও সরকারি ক্রয় আইনের মারপ্যাঁচে অনভিজ্ঞ একজন মহাপরিচালকের কারণে যখন এই প্রকল্পগুলোতে ফাইল জট, বাস্তবায়ন ধীরগতি এবং দাপ্তরিক সমন্বয়হীনতা দেখা দেবে, তখন দাতা সংস্থাগুলো ফান্ডের কিস্তি ছাড় করা স্থগিত রাখতে পারে। এর ফলে দেশের প্রান্তিক ধর্মীয় শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক মেগা প্রজেক্টগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্থবির হয়ে পড়ার গভীর আশঙ্কা তৈরি হবে।

 

ইসলামী ব্যাংকিং খাতের শরিয়াহ কাঠামোর স্থায়ী ধস: তিনি যেভাবে ২০১৭ সাল থেকে এস আলম গ্রুপের করপোরেট সহযোগী হয়ে ১০টি ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের শীর্ষ পদে বসে ভুয়া ঋণ ও অর্থপাচারের প্রক্রিয়াকে নৈতিক ছাড়পত্র দিয়েছেন, তা দেশের সামগ্রিক ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আস্থার ভিতটি দীর্ঘমেয়াদে ধসিয়ে দেবে। সাধারণ মানুষ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারবেন যে এদেশের শরিয়াহ গভর্ন্যান্স কেবলই একটি কাগুজে মুখোশ।

 

শরিয়াহর দৃষ্টিতে ইমামতি ও বেতন-ভাতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

 

ইসলামী শরিয়াহর ফিকহী বিধান এবং কেয়েকজন বিশিষ্ঠ ফকিহ এর মতামত অনুসারে, সাধারণ মুক্তাদিদের নামাজ আল্লাহর রহমতে সম্পূর্ণ শুদ্ধ হলেও, মিথ্যা বা অসঙ্গতিপূর্ণ সনদের ওপর ভিত্তি করে মেহরাবে দাঁড়ানোর বিষয়টি নৈতিকভাবে বড় ধরনের খেয়ানত । নথিপত্র প্রস্তুতকরণে অসঙ্গতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েও বায়তুল মোকাররমে দীর্ঘদিন নিয়োগ বহাল রাখা এবং ওই পদের বিপরীতে সরকারি বেতন-ভাতা কিংবা করপোরেট ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে কতটুকু হালাল বা বৈধ, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন ও গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে ।

 

সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্ন সাপেক্ষ

 

বর্তমান সরকার যখন রাষ্ট্র সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছে, তখন ২০-২৫ বছরের ফিডার পদের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক সেবার প্রচলিত নিয়ম ডিঙিয়ে এমন নজিরবিহীন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সরকারের “প্রশাসনিক সংস্কারের” মূল নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে । ২০১৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তদন্তেই যার শিক্ষাগত ভিত্তি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিপত্র প্রস্তুতকরণে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়েছিল, তাকেই সমস্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ম ভেঙে দেশের একটি অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে বসানো হয়েছে। এই খতিয়ান জাতীয়ভাবে প্রকাশ পাওয়া মাত্রই তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ও দণ্ডবিধি (পেনাল কোড) অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা নৈতিক বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

এই বাংলা/এমএস

টপিক

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here