নির্বাচন–পূর্ব সংকট ও সম্ভাবনা: গণতন্ত্রের নতুন পথচলার সামনে বাংলাদেশ

0
204
অধ্যাপক ড. সুলতান মাহমুদ রানা / ছবি - সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি :

দেশ আজ এক সংকটময় অথচ সম্ভাবনাময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। একদিকে নির্বাচনী উত্তাপ বাড়ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কার, অংশগ্রহণ এবং জনবিশ্বাস পুনর্গঠনের প্রশ্ন গুলো তীব্রভাবে সামনে আসছে। এবারের নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিযোগিতা নয়; এটি হবে গণতান্ত্রিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারের বড় পরীক্ষা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার অভাব ছিল স্পষ্ট। এ কারণে এবারের নির্বাচন কেবল আরেকটি নির্ধারিত নির্বাচন নয়—এটি একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ, যার মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপি ইতিমধ্যে বড় পরিসরে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে, জামায়াতও বহু আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তবে প্রার্থী বাছাই–পরবর্তী অস্থিরতা, বিদ্রোহ বা বিভাজন দলীয় সংগঠনকে চাপে ফেলছে। একই সঙ্গে RPO সংশোধন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট প্রস্তাব—এসব প্রশ্ন নির্বাচনী পরিবেশকে জটিল করছে।

সাধারণ নাগরিকেরা যেমন পরিবর্তনের আশা করছেন, তেমনি ভরসাহীনতার ভয়ও রয়েছে। অংশগ্রহণ মানে শুধু ভোট প্রদান নয়—ফলাফল মেনে নেওয়া, প্রতিযোগিতার সাম্য নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

দেশের রাজনৈতিক পরিসরে ইসলামি দলগুলোর নতুন সক্রিয়তা লক্ষণীয়। আগামী দিনে এ শক্তির রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশল সংসদীয় প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা আনতে পারে।

তথ্য ও মিডিয়া পরিবেশও অভূতপূর্বভাবে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব দেখিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া এখন ভোটার মনস্তত্ত্ব থেকে শুরু করে ফলাফল গ্রহণ পর্যন্ত সব প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলবে।

১. নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা: যদি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়, তাহলে এটি দায়বদ্ধ রাজনীতির নতুন সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।
২. নতুন মানদণ্ড গঠনের সুযোগ: নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলো মিলিতভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনার বিরল সুযোগ পাচ্ছে।
৩. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার পুনর্গঠন: অবাধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যদি ভোট হয় সীমিত প্রতিযোগিতায়, ভয়–শঙ্কার পরিবেশে, কিংবা স্বল্প অংশগ্রহণে, তাহলে গণতন্ত্রের যে আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে তা আরও গভীর হতে পারে। অতীতের মতো একতরফা বা আংশিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন জাতীয় ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

নির্বাচন কমিশনের হাতে এখন কোনো বিলম্বের সুযোগ নেই। প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রচারণার স্বাধীনতা—সবকিছু দ্রুতগতিতে নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক সমাজকেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে, কারণ অংশগ্রহণ কেবল ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি গণতান্ত্রিক চর্চার ধারাবাহিক অংশ।

আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ হয়ে উঠতে পারে। দায়িত্বশীলতা, অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এগোতে পারলে এ নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণের ঘটনা হবে না; এটি হবে রাজনৈতিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের একটি ধাপ, গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের সুযোগ।

দেশের ভবিষ্যতের পক্ষে রাজনৈতিক শক্তিগুলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—সহযোগী হতে পারলে আগামী নির্বাচনী প্রক্রিয়াই হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন জন্মসনদ।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এই বাংলা/এমএস

টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here