নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর হঠাৎ করেই নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে অস্বাভাবিক নড়চড় শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকা গার্মেন্টস অধ্যুষিত এই জেলায় রাসেল গার্মেন্টসকে ঘিরে সাম্প্রতিক শ্রমিক অচলাবস্থা শুধু একটি কারখানার সংকট নয়—বরং এর পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে করছেন শিল্প মালিক, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সূত্রের একাংশ।
তাদের মতে, শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির একটি ছক বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা গেলেও নারায়ণগঞ্জ ছিল ব্যতিক্রম। বড় ধরনের সহিংসতা বা দীর্ঘ কর্মবিরতি এখানে ঘটেনি। কিন্তু নির্বাচন সামনে আসতেই একের পর এক কারখানায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে—যার কেন্দ্রে উঠে এসেছে রাসেল গার্মেন্টস।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি স্বাভাবিক শ্রমিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং বাইরে থেকে উসকানি দেওয়া একটি পরিকল্পিত পরিস্থিতি।
অভিযোগ উঠেছে, এই অচলাবস্থার নেপথ্যে রয়েছেন রাসেল নামের এক ব্যক্তি, যিনি একসময় আওয়ামী লীগের শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বর্তমানে তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্যানারে নিজেকে শ্রমিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারখানা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, শ্রমিকদের নিয়ম ভাঙাকে ‘অধিকার’ হিসেবে তুলে ধরে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উসকে দেওয়াই ছিল তার মূল কৌশল।
রাসেল গার্মেন্টসে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক কর্মরত। তবে কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়মিতভাবে শতাধিক শ্রমিক অনুমতি ছাড়াই অনুপস্থিত থাকতেন এবং কয়েকদিন পর হঠাৎ কাজে যোগ দিতেন। এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই শ্রমিকদের মধ্যে উসকানি ছড়ানো হতো।
কারখানার এক কর্মকর্তা বলেন, “ধীরে ধীরে শ্রমিকদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে নিয়ম মানা মানেই দুর্বলতা।”
১৩ ডিসেম্বর একটি তুলনামূলক ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এক শ্রমিক চাচার মৃত্যুর কথা জানিয়ে ছুটি চাইলে নিয়ম অনুযায়ী কারখানায় এসে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিষয়টি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করা হয়।
পরবর্তীতে জেনারেল ম্যানেজার অপসারণের দাবিতে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকরা জোরপূর্বক কারখানায় ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকে চাবি নিয়ে স্টাফদের বের করে দেয় এবং পুরো কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং টানা কয়েকদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানাটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। মালিকপক্ষ জানায়, এটি ছিল বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত, কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নয়।
পরবর্তীতে প্রশাসনের সামনে শ্রমিকরা লিখিত অভিযোগ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের উপ-মহাপরিদর্শক রাজীব চন্দ্র ঘোষ বলেন,
“শ্রমিকদের উত্থাপিত অধিকাংশ দাবিই শ্রম আইন বহির্ভূত। প্রাথমিকভাবে বিষয়টি পরিকল্পিত অসন্তোষ বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। এ ঘটনায় ৪২ জন শ্রমিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ মহানগর সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী মুফতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, “রাসেল আমাদের সংগঠনের কেউ নন। আমি সেখানে গিয়ে শুধু আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।”
এই ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গার্মেন্টস মালিকদের আশঙ্কা, নির্বাচনের প্রাক্কালে শ্রমিক অসন্তোষকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলে অরাজকতা সৃষ্টি করা হতে পারে।
তাদের প্রশ্ন—শ্রমিকের দাবির নামে যদি শিল্প ধ্বংসের রাজনীতি শুরু হয়, এর দায় নেবে কে?
প্রতিবেদক: খায়রুল আলম হিরু নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
এই বাংলা/এমএস
টপিক

