নাটোর প্রতিনিধি :
ঝুঁকিতে থাকা প্রতিবন্ধী শিশু ও বিভিন্ন বয়সী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে নাটোরের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, দক্ষ থেরাপিস্ট এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় পরিচালিত এ কেন্দ্রটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিপরীতে অবস্থিত। দেশের ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের মধ্যে এটি অন্যতম।
কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে নিবন্ধিত ৫০৪ জন চিকিৎসা গ্রহণকারীর মধ্যে ২১৪ জনই ছিলেন প্রতিবন্ধী শিশু। শিশুদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষও এখানে সেবা গ্রহণ করছেন। গত অর্থবছরে প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা নারী-পুরুষসহ প্রায় ১৪ হাজার মানুষ ১২টি ধাপে বিভিন্ন ধরনের সেবা পেয়েছেন। পাশাপাশি মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণও বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ কেন্দ্রের নিবন্ধিত ১১ হাজার ২২ জন সেবাগ্রহীতা মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ২৪২টি সেবা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে নিবন্ধিত ২ হাজার ৮৮ জন ব্যক্তি ৯ হাজার ৪৬১টি সেবা পেয়েছেন।
এ পর্যন্ত কেন্দ্রটি থেকে বিনামূল্যে ১ হাজার ৪৬৪টি হুইলচেয়ার, ১২২টি ট্রাইসাইকেল, ২১০টি সাদা ছড়ি, ১৯১টি হিয়ারিং এইড এবং তিন শতাধিক অন্যান্য সহায়ক উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রে জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার নেতৃত্বে একজন ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট, দুইজন থেরাপি সহকারী, দুইজন টেকনিশিয়ানসহ ১০ জন দক্ষ জনবল কর্মরত রয়েছেন। এখানে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং স্পিচ প্যাথলজি সেবা প্রদান করা হয়।
শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোমসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এ জন্য কেন্দ্রটিতে আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, আইএফটি, টেন্স, ইএমএস, এসডব্লিউডি, আইআরআর ও ট্র্যাকশনসহ ১২৭ সেট আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০ জন নতুন ও পুরোনো সেবাগ্রহীতা দুই থেকে তিন ধরনের থেরাপি গ্রহণ করেন। থেরাপি সহকারী কাওসার হুসাইন জানান, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন এ দুটি বিভাগে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগী সেবা নেন। থেরাপি সহকারী শেফালী খাতুন বলেন, ইলেকট্রিক থেরাপি ও বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামভিত্তিক চিকিৎসা নিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী প্রতিদিন আসেন।
গুরুদাসপুর উপজেলার ধানুড়া বগুড়াপাড়া গ্রামের ছয় বছর বয়সী সিনহার মা আনজুয়ারা জানান, জন্মের পর থেকেই মেয়ের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক ছিল না। কেন্দ্রটিতে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি নেওয়ার পর তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
সিংড়া উপজেলার বাসিন্দা আলম হোসেন বলেন, অটিজমে আক্রান্ত ছেলে আব্দুল্লাহকে নিয়ে তিনি অনেক আশা নিয়ে এ কেন্দ্রে এসেছেন। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার উল্লাপাড়া এলাকার হোসাইন আহমদ জানান, সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে উম্মে হানি এক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন দাঁড়াতে পারছে। কেন্দ্রের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেও থেরাপি চালিয়ে যাচ্ছেন।
কেন্দ্রের ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট ডা. সুবর্ণা সরকার বলেন, নিবন্ধনের পর রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। এরপর সমন্বিতভাবে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, কাউন্সেলিং ও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রের প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা ভক্ত প্রসাদ দাস বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে কিছু যন্ত্রপাতি অচল হয়ে গেছে। নিলাম কমিটি গঠন জটিলতায় ২০২১ সাল থেকে সেগুলো অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া দূরবর্তী এলাকার শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সুবিধার্থে ১০ শয্যার একটি আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

