কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :
রংপুর বিভাগের গ্রামবাংলায় বহু প্রজন্ম ধরে জনপ্রিয় একটি খাবার হলো ‘সিদল’— ছোট মাছের শুঁটকি ও কচুর ডাঁটা দিয়ে তৈরি বিশেষ প্রস্তুতি। রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় অঞ্চলে এটি একসময় ঘরোয়া রান্নার অপরিহার্য অংশ ছিল। অনন্য স্বাদ ও গন্ধের জন্য খাবারটি এখনও অনেকের কাছে অতিপ্রিয়।
দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
একসময় পারিবারিক অনুষ্ঠান, আত্মীয় বাড়িতে পাঠানো সওদা কিংবা অতিথি আপ্যায়নে সিদলের ব্যবহার ছিল নিয়মিত। হাটে-বাজারেও স্থানীয় নারীদের তৈরি এই খাবার বিক্রি হতো। কিন্তু দেশীয় ছোট মাছের সংকট ও সময়ের পরিবর্তনে আজ এই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন আর দেখা যায় না সিদল বানানোর সেই ব্যস্ততা। মাঝে-মাঝে শখের বশে কেউ কেউ তা তৈরি করেন।
সিদল তৈরির মূল উপাদান হলো ছোট মাছ— মলা, ডারকা, পুঁটি ইত্যাদি।
১) মাছ ধুয়ে কড়া রোদে ৫–৬ দিন শুকিয়ে শুঁটকি বানানো হয়।
২) শুকনো মাছ উরুনগান বা শিল–পাটায় আধাভাঙা করে নেওয়া হয়।
৩) সাদা মানকচু ও কালো কচুর ডাঁটা কাঁচা অবস্থায় বাটা হয়।
৪) এরপর কচুবাটার সাথে মাছের গুঁড়া, শুকনা মরিচ, লবণ, রসুন–আদা বাটা মিশিয়ে রাখা হয়।
৫) পরদিন হলুদ ও সরিষার তেল মেখে মণ্ডকে ছোট চ্যাপটা বা গোল আকারে তৈরি করে ৫–৬ দিন রোদে শুকানো হয়।
৬) শুকালে সিদল সংরক্ষণ করা হয়— সাধারণত শুকনো পাতিলে সামান্য ছাই দিয়ে বা প্লাস্টিকের বক্সে ফ্রিজে রেখে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে ৩ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে।
সিদল দিয়ে কাতলা বা বোয়ালের সাথে ঝাল রান্না খুবই জনপ্রিয়। শাক দিয়ে রান্নাও প্রচলিত। তবে সবচেয়ে সমাদৃত রেসিপি হলো সিদল ভর্তা— ভাত নামানোর ঠিক আগে সিদল ভাতে দিয়ে সিদ্ধ করা হয়। পরে তেলে ভেজে পেঁয়াজ, রসুন, ভাজা মরিচ ও সরিষার তেল দিয়ে বাটা হয়।
ঘোগাদহ ইউনিয়নের সোনালির কুটি গ্রামের মোছাঃ হাসনা বেগম বলেন, “একসময় খাল-বিল-নদীতে দেশি ছোট মাছ ছিল ভরপুর। তখন সিদল বানানো ছিল শখের পাশাপাশি পেশাও। এখন মাছের সংকটে আর সময়ের কারণে বানানোই হয় না।”
কালীগঞ্জের সাবিনা বেগম জানান, “একসময় বছরজুড়ে বাড়িতে সিদল থাকত। এখন শুধু ছেলে-মেয়েরা শহর থেকে এলেই বছরে এক-দু’বার বানাই।”
রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাকির আহমদ জানান, তিন বছর আগে শেষবার সিদল খেয়েছেন। আগে মাসে দুই–তিনবার সিদল দিয়ে রান্না খাওয়া হতো। এখন মাছ পাওয়া গেলেও দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই আর সিদল বানাতে আগ্রহী নন।
রংপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বরুণ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় দূষণ, নদ–নালার নাব্যতা কমে যাওয়া, খাল-বিল ভরাট হওয়া, প্রজনন ব্যাহত হওয়া— এসব কারণে দেশি ছোট মাছের প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে। তাই আগের মতো সিদল আর পাওয়া যায় না।
দেশীয় মাছ রক্ষায় অভয়াশ্রম তৈরি এবং উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি জানান।
সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে রংপুর অঞ্চলের এই সুস্বাদু ঐতিহ্য। তবুও শখ আর স্মৃতির টানে অনেক পরিবার এখনও সিদলের স্বাদ টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এই বাংলা/এমএস
টপিক

