দুই দফা নদীভাঙনে নিঃস্ব মিনারার পরিবার, খোলা আকাশের নিচে ৭০ পরিবার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

গাইবান্ধায় তিস্তার ভাঙনে বসতভিটা হারানোর চার বছর পর এবার কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদ কেড়ে নিয়েছে শেষ আশ্রয়টুকুও। দুই দফা নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে চার সন্তানকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন মোছাঃ মিনারা বেগম (৫৫)।

বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরে গিয়ে দেখা যায়, উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্রে তীব্র স্রোতের কারণে ভয়াবহ নদীভাঙন চলছে। নদী ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছে গেছে বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পর্যন্ত। ইতোমধ্যে প্রকল্পসংলগ্ন সাতটি বিদ্যুতের খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গত সাত দিনে কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরের অন্তত ৭০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

মিনারা বেগম জানান, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তার চরে ছিল তাদের বসতভিটা। চার বছর আগে তিস্তার ভাঙনে সব হারিয়ে স্বামী মোঃ সাইফুল ইসলাম (৬০) ও সন্তানদের নিয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার কড়াইবরিশাল চরের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে তার বোনের ঘরে আশ্রয় নেন। কিন্তু তিন দিন আগে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

চার সন্তানকে পাশে নিয়ে ভাঙা ভিটার ধারে বসে মিনারা বেগম বলেন, “এলাও মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইনি।”

কৃষিশ্রমিক সাইফুল ইসলাম মৌসুমে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজের কোনো জমিজমা বা স্থায়ী ঘরবাড়ি না থাকায় নদীভাঙনের পর থেকে একের পর এক অন্যের আশ্রয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

চোখের পানি মুছতে মুছতে মিনারা বেগম বলেন, এই চরে আসার পর বহু চেষ্টা করেও ভোটার হতে পারেননি। অর্থের অভাবে জাতীয় পরিচয়পত্রও করতে পারেননি। ফলে মঙ্গলবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও ভোটার আইডি না থাকায় তারা কোনো সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

একই দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন শাখাহাতি চরের বাসিন্দা মোঃ আতাউর রহমান (৩৫)। গত রোববার ব্রহ্মপুত্র নদে তার বসতভিটাও বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ছোট সন্তানকে নিয়ে প্রতিবেশীর বারান্দায় রাত কাটাচ্ছেন তিনি।

আতাউর রহমান বলেন, “চর এলাকায় বাড়ি করতে জমি চুক্তিতে নিতে হয়। এর জন্য প্রায় এক লাখ টাকা লাগে। সেই সামর্থ্য আমার নেই।”

কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে কুড়িগ্রামের ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার অন্তত ৪০টির বেশি স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের শাখাহাতি ও কড়াইবরিশাল চরের ভাঙন সবচেয়ে তীব্র। ঝুঁকিতে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়নের একমাত্র নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কড়াইবরিশাল বাজার।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন, উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীতে ৪০টির বেশি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি স্থানে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। তবে শাখাহাতি ও কড়াইবরিশাল চর নদীর মাঝখানে হওয়ায় পাউবোর নীতিমালা অনুযায়ী সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা সম্ভব নয়।

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন, গত কয়েক দিনে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে চিলমারী উপজেলার শাখাহাতি, কড়াইবরিশাল ও বিশারচর এলাকার অন্তত ৭০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে জিআরের চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

এই বাংলা/এমএস                                                                                                                                                                                                                                              টপিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here