তীব্র গরমে চিলমারীর চরাঞ্চলের নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে, বাড়ছে ত্বক ও মূত্রনালির সংক্রমণ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

 

চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন চরাঞ্চলের শ্রমজীবী নারীরা। দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ, অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের মধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে চরাঞ্চলের নারীদের মধ্যে মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই), ত্বকের বিভিন্ন রোগ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতার অভিযোগ বেড়েছে। চরের বালুময় পরিবেশ, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করার কারণে চুলকানি, ত্বকে লাল দানা, ঘামাচি ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণের প্রকোপও বৃদ্ধি পেয়েছে।

চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ভায়া ইনচার্জ মোছা. শারমিন সুলতানা বলেন, অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করলে শরীরে ঘাম জমে থাকে, যা ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা নারীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাসে জরায়ু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রাথমিক সেবা নিয়েছেন ১৬ জন নারী। চলতি জুন মাসের প্রথম ১০ দিনেই এ ধরনের সেবা নিয়েছেন আরও ১১ জন।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

চিলমারী, নয়ারহাট ও অষ্টমীরচর এলাকার বিভিন্ন কৃষি জমিতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও দীর্ঘ সময় কাজ করছেন। ফলে অতিরিক্ত গরমে তারা দ্রুত পানিশূন্যতায় ভুগছেন এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন।

চিলমারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বাসিন্দা মিমি খাতুন বলেন, “প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে খুব কষ্ট হয়। শরীর দুর্বল লাগে, মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে। কিন্তু সংসারের প্রয়োজনে কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই।”

একই এলাকার রুপা খাতুন বলেন, “সারাদিন মাঠে কাজ করতে হয়। অনেক সময় ভেজা কাপড় পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না। কয়েকদিন ধরে ত্বকে চুলকানি ও জ্বালাপোড়ার সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু চিকিৎসা নেওয়ার সময় পাচ্ছি না।”

আবহাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুন মাসের প্রথম ১০ দিনে কুড়িগ্রামে গড় তাপমাত্রা ছিল ৩০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময়ে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি এবং গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৭১ শতাংশ।

আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মো. শামছুদ্দোহা বলেন, বর্তমানে কুড়িগ্রাম অঞ্চলে আর্দ্রতার হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় মানুষের শরীরে গরমের অনুভূতি অনেক বেশি হচ্ছে। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে ঘাম সহজে শুকাতে না পারায় অস্বস্তি ও তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. বেলাল হোসেন এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এসএসিএমও মো. জিয়াউল হক জানান, তাপপ্রবাহের কারণে নারীদের মধ্যে ত্বক ও প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার অভিযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. প্রান্ত সরকার বলেন, “তীব্র গরমে ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক পোশাক পরা, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা এবং শরীর পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি। অতিরিক্ত ঘাম ও দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় পরে থাকলে ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।”

তিনি আরও বলেন, মাঠে কাজ শেষে শরীর শুকনা রাখা, ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত পরিবর্তন করা এবং নিয়মিত গোসলের মাধ্যমে ত্বক ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

এই বাংলা/এমএস

টপিক 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here